সংসদের ভেতরে সরকারের পাশে থাকার কথা বলে বাইরে এসে ভিন্ন অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তুলে জামায়াতে ইসলামীকে তোপ দেগেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। তাঁর অভিযোগ, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে একটি মহল আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপনে সহযোগিতা করছে। চলমান রাজনীতি নিয়ে বক্তব্যের পাশাপাশি নাসিরনগরে তরুণদের মাঠমুখী করা, তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরি ও ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন তিনি।
- ‘সংসদের ভেতর এক কথা, বাইরে আরেক’—অস্থিতিশীলতার চেষ্টার অভিযোগ
- নাসিরনগরে আধুনিক স্টেডিয়ামের ঘোষণা
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। পরে আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬’-এর ফাইনাল উদ্বোধন করেন তিনি।
‘মুখে এক কথা, অন্তরে আরেক’
সংসদের বিরোধী দলনজামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘সংসদের ভেতরে তারা বলে, আমরা তো আপনাদের সঙ্গেই আছি, আপনাদের সব কাজে সমর্থন করছি। কিন্তু বাইরে এলেই তাদের ভিন্ন রূপ দেখা যায়। মুখে এক কথা, অন্তরে আরেক কথা।’ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারির সরকারবিরোধী বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, সরকার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।

তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের ‘দোসরদের’ সঙ্গে যোগসাজশ করে কেউ কেউ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। নির্বাচনের আগের প্রচারণার প্রসঙ্গ টেনে আমিনুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন।’ তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচার ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সরকারের সাত মাসের খতিয়ান
সরকারের গত সাত মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে আমিনুল হক পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা, পরিবেশ রক্ষা এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা বলেন। জাতিসংঘ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে চার দিনে ৩২টি বৈঠকে অংশ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এসব বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তাপের পর মাঠে ক্রীড়ার বার্তা
নাসিরনগরের দ্বিতীয় কর্মসূচিতে আমিনুল হকের বক্তব্যের সুর বদলে যায়। সেখানে তাঁর মূল বার্তা ছিল তরুণদের মাঠে ফেরানো এবং ক্রীড়াকে সামাজিক ও যুব উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। ‘আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট’-এর ফাইনালে দর্শকদের বিপুল উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই উপচে পড়া ভিড়ই প্রমাণ করে খেলাধুলার প্রতি মানুষের ভালোবাসা কতটা গভীর। আমাদের সরকার খেলাধুলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।’ এরপরই নাসিরনগরের ক্রীড়া অবকাঠামো নিয়ে বড় ঘোষণা দেন তিনি। বলেন, ‘নাসিরনগরে একটি আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হবে।’ আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্মতি দিলে মাঠের চারপাশে উন্নত গ্যালারি নির্মাণের কথাও জানান।
বিশ্বকাপের স্বপ্ন, শুরু ইউনিয়ন থেকে
বাংলাদেশ একদিন ফুটবল বিশ্বকাপে খেলবে—এমন স্বপ্ন দেখাকে দোষের কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৃণমূল থেকেই খেলোয়াড় তৈরির ওপর জোর দেন তিনি। ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট, হকি ও অন্যান্য খেলায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর দ্বিতীয় আসনের তথ্য তুলে ধরেন আমিনুল হক। তাঁর দেওয়া হিসাবে, ইতোমধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ২৩ হাজার অনলাইন নিবন্ধন হয়েছে। কিশোরদের পাশাপাশি কিশোরীদের অংশগ্রহণও প্রায় সমান। আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী এই আয়োজনের উদ্বোধন করতে পারেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ছয় থেকে সাত মাসব্যাপী এই আয়োজনে দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন অংশ নেবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
পর্দা ছাড়িয়ে মাঠে ফেরানোর লক্ষ্য
শিশু-কিশোরদের একটি অংশ দীর্ঘ সময় ডিজিটাল যন্ত্রে ব্যস্ত থাকে উল্লেখ করে তাদের মাঠমুখী করার ওপর জোর দেন আমিনুল হক। তাঁর মতে, খেলাধুলা তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এর স্থায়ী সুফল পেতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচ, মাঠের প্রাপ্যতা এবং প্রতিভা বাছাইয়ের ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

যুব কর্মসংস্থানেও জোর
যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামীর বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের সম্পৃক্ত করা হবে। তিনি বলেন, ‘আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করব।’ নাসিরনগরের দুই কর্মসূচিতে একই দিনে আমিনুল হকের বক্তব্যে তাই দুটি আলাদা দিক সামনে এসেছে। একদিকে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা, অন্যদিকে তরুণদের জন্য ক্রীড়া অবকাঠামো ও তৃণমূলভিত্তিক প্রতিভা অন্বেষণের পরিকল্পনা।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নান, ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপিয়াসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
আরআই/এমকে