চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। আগামী ৯ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার। এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাজির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নাম আলোচনায় থাকলেও অসলোর পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআইও) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকোন জারলো মনে করেন, শান্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন আলোচনার বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে জারলো বলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার জনপ্রিয়তা বা তারকা খ্যাতির প্রতিযোগিতা নয়। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করা আদালত, যুদ্ধাপরাধের তথ্য সংগ্রহকারী সাংবাদিক এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষকে সহায়তা করা মানবিক সংস্থাগুলো শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আলোচনায় ট্রাম্প-জেলেনস্কি
এবারের পুরস্কার নিয়ে আলোচনায় ট্রাম্প ও জেলেনস্কির নাম থাকলেও জারলো তাঁদের নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে শান্তি পুরস্কার দিলে পুরস্কারটি কোনো একটি পক্ষের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে জেলেনস্কি একটি চলমান বড় যুদ্ধের দেশের কমান্ডার-ইন-চিফ হওয়ায় তাঁকে পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতের প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মত দিয়েছেন তিনি।
তবে এগুলো জারলোর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত নয়। নোবেল কমিটি স্বাধীনভাবে প্রার্থীদের মূল্যায়ন করে এবং পুরস্কার ঘোষণার আগে কোনো প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয় না।
আদালত থেকে মানবিক সংগঠন—আলোচনায় যারা
জারলোর পছন্দের তালিকায় রয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইন শক্তিশালী করতে এবং বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য—এই নীতি প্রতিষ্ঠায় দুটি আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া যুদ্ধের মধ্যে শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করা সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউক্রেনে রাশিয়া ও অধিকৃত অঞ্চল থেকে শিশুদের ফিরিয়ে আনার কাজে যুক্ত মাইকোলাইলা কুলেবার নেতৃত্বাধীন সেভ ইউক্রেন এবং সুদানের যুদ্ধের মধ্যে খাবার ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমসের নামও তাঁর তালিকায় রয়েছে।
যুদ্ধের তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের ভূমিকা
শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন জারলো। যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য নথিভুক্ত করতে সাংবাদিকেরা অনেক সময় জীবন ঝুঁকিতে কাজ করেন।
এ কারণে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-কেও সম্ভাব্য শান্তি পুরস্কারপ্রাপক হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। জারলোর নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৩২ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হন, যা সিপিজের হিসাব অনুযায়ী তাদের নথিভুক্ত ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনও তালিকায়
অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বজায় রাখার উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) কথাও বলেছেন জারলো।
তাঁর মতে, পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও আইএসএসে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২৫ বছরের বেশি সময়ের এই সহযোগিতাকে শান্তির প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সংঘাতের সময়ে বাড়ছে শান্তি পুরস্কারের গুরুত্ব
জারলো তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে বিশ্বে ৬৫টি রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ১৯৪৬ সালে তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ বলে পিআরআইওর গবেষণায় উঠে এসেছে। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের মাত্রা বাড়ার কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বও বেড়েছে।
এদিকে বাজির বাজার পলিমার্কেটের তথ্য উদ্ধৃত করে জারলোর নিবন্ধে সেভ দ্য চিলড্রেন, সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নাম সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বাজারের সম্ভাবনা কোনোভাবেই নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক পূর্বাভাস নয়।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হবে আগামী ৯ অক্টোবর। সেদিনই জানা যাবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠছে।
সন্ধানী বার্তা/এসএ