অর্থনীতি

দরের তালিকা এক, বাজারে ডলারের দাম আরেক

কাগজে-কলমে এক দর, বাস্তবে আরেক। মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমসিএবি) ঘোষণায় খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রির সর্বোচ্চ দর ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন মানি চেঞ্জারে সেই দামে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ১২৭ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত। অর্থাৎ সংগঠনটির নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি ডলারে সর্বোচ্চ এক টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। অবশ্য এমসিএবির দাবি, তাদের সদস্যরা নির্ধারিত দরেই ডলার কেনাবেচা করছেন। ফলে ঘোষিত দর ও বাস্তব বাজারদরের এই ব্যবধান নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ধোঁয়াশা।

সরেজমিন রাজধানীর নয়াপল্টন, দিলকুশা ও গুলশানের বিভিন্ন মানি চেঞ্জার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যতালিকায় ডলারের ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তালিকায় থাকা দরে সব জায়গায় ডলার কিনতে পারছেন না গ্রাহক। নয়াপল্টনের ‘মন্ডাইল মানি এক্সচেঞ্জ’-এর মূল্যতালিকাতেও ডলারের ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা লেখা রয়েছে। তবে ডলারের দাম জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, ‘দাম লাগব ১২৬.৩০ টাকা।’ একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, গ্রাহক ডলার কিনবেন নাকি বিক্রি করবেন।

এলাকাভেদে ভিন্ন দর
নয়াপল্টনের মতো রাজধানীর অন্য এলাকাতেও ঘোষিত দরের সঙ্গে বাস্তব লেনদেনে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। দিলকুশার ‘এসোসিয়েটেড মানি চেঞ্জার’ এবং ‘গ্লোরী মানি এক্সচেঞ্জ লিমিটেড’-এ প্রতি ডলার ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে গুলশানের ‘বিকেবি মানি এক্সচেঞ্জ প্রাইভেট লিমিটেড’-এ ডলারের বিক্রয়দর ছিল ১২৬ টাকা ৩০ পয়সা। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনের সময় তালিকায় উল্লেখ করা দরে ডলার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নগদ ডলারের চাহিদা থাকলে অনেক গ্রাহককে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। এমসিএবির নির্ধারিত দরের বাইরে ডলার বিক্রির বিষয়ে সংগঠনটির মহাসচিব প্রকৌশলী গৌতম দে বলেন, ‘আমাদের সদস্যরা নির্ধারিত ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সাতেই লেনদেন করছে।’ তার বক্তব্যের সঙ্গে সরেজমিনে পাওয়া বাজারচিত্রের পার্থক্যই এখন প্রশ্ন তৈরি করেছে—তাহলে নির্ধারিত দরের বাইরে অতিরিক্ত দামে ডলার বিক্রি হচ্ছে কোথায় এবং কারা করছে?

ব্যাংকে ১২৫, খোলাবাজারে ১২৭.৫০
ডলারের বাজারে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয় ব্যাংকের দরের সঙ্গে তুলনা করলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৯ পয়সা দরে লেনদেন হয়েছে। একই দিনে ব্যাংকগুলো নগদ ডলার সর্বোচ্চ ১২৫ টাকা দরে বিক্রি করেছে। বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংকের তথ্যও একই চিত্র দেখায়। ব্যাংকটি ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার কিনে নগদ ডলার বিক্রি করেছে ১২৫ টাকা দরে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বৈধভাবে নগদ ডলার কেনার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত ডলার না পাওয়ার কারণে অনেক গ্রাহককে খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত দামের চাপ। খোলাবাজারে সর্বোচ্চ ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার কিনলে ব্যাংকের সর্বোচ্চ বিক্রয়দর ১২৫ টাকার তুলনায় প্রতি ডলারে গ্রাহকের বাড়তি খরচ হচ্ছে ২ টাকা ৫০ পয়সা। বড় অঙ্কের ডলার কেনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।

চাহিদার চাপেই কি বাড়তি দর?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, ব্যাংকগুলো প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নগদ ডলার দিতে না চাওয়ায় খোলাবাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে সেখানে নগদ ডলারের চাহিদা বাড়ছে এবং সেই সুযোগে কোনো কোনো মানি চেঞ্জার বাড়তি দামে ডলার বিক্রি করছে। তবে বাজারে ডলারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেটের ওপর কোনো নির্দেশনা দেবে না। কারণ বাজারে ডলারের দাম চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। তবে কেউ কারসাজি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ফলে এখন মূল নজর থাকবে বাজারে ডলারের প্রকৃত সরবরাহ, মানি চেঞ্জারগুলোর লেনদেন এবং ঘোষিত দরের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টির ওপর। ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা না থাকলেও ঘোষিত দর ও বাস্তব লেনদেনের মধ্যে এই পার্থক্য সাধারণ গ্রাহকের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে যারা চিকিৎসা, শিক্ষা, ভ্রমণ কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নগদ ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদেরই দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। বাজারে ডলারের দাম চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে—বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অবস্থান স্পষ্ট। তবে সেই বাজারে নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারসাজি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার যে সতর্কবার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে, তার বাস্তব প্রয়োগই পারে ঘোষিত দর আর গ্রাহকের পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া দামের ব্যবধান কমাতে।

এম/এএইচ


সম্পর্কিত খবর