এক্সক্লুসিভ

কওমি মাদরাসায় ৬ বোর্ড, দেশেই তৈরি হবে ড্রোন: জ্বালানি সংকটেও বড় পরিকল্পনা সরকারের

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণে ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে এসব বোর্ডের সনদকে নির্দিষ্ট দুটি মাদরাসা পদে নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও সংসদকে জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সশস্ত্র বাহিনীর সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা পর্যালোচনার পাশাপাশি দেশীয়ভাবে ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গ্যাস অনুসন্ধান, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানি সম্প্রসারণ এবং নতুন টার্মিনাল স্থাপনের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন তিনি।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের তৃতীয় দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের লিখিত জবাবে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

কওমি মাদরাসায় ছয় শিক্ষা বোর্ড
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের সব কওমি মাদরাসার সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে ২০০৬ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীন কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালে আইন প্রণয়ন করা হয়।

ওই আইনের আওতায় ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বোর্ডগুলো হলো—বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ, তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ এবং জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ।

কওমি সনদে মিলবে চাকরির সুযোগ
কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের চাকরির সুযোগ তৈরির বিষয়েও সংসদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, গত ২৩ জুন ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৬’ সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালায় সহকারী মৌলভী (ক্বারী) এবং ইবতেদায়ি ক্বারী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ওই ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সনদকে কাম্য যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) ডিগ্রির পাশাপাশি ইলমে কিরাআত অথবা হিফজুল কোরআন সনদধারীরাও সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে চাকরির জন্য নতুন সুযোগ পাবেন।

দেশেই তৈরি হবে ড্রোন
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের জন্য সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সমুদ্রে নজরদারি ও পরিস্থিতিগত সচেতনতা জোরদারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার বিষয়েও সংসদে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সময়ে দেশের সার্বিক নিরাপত্তায় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘Instruction regarding In Aid to the Civil Power’-এর আওতায় বিভিন্ন দুর্যোগ ও ক্রান্তিকালীন সময়ে অসামরিক প্রশাসনকে সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা দেওয়া হয়। The Code of Criminal Procedure, 1898-এর ১২৯ ধারার আওতায় আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

গ্যাস সংকট কাটাতে ১৫০ কূপের কর্মসূচি
দেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে বর্তমান জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সরকারের ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপ খনন সম্পন্ন হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হয়েছে। চলমান আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

দেশজুড়ে সাইসমিক জরিপ
নতুন গ্যাসের উৎস খুঁজতে বড় পরিসরে সাইসমিক জরিপের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এর আওতায় ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড—বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে।

অফশোর-অনশোর অনুসন্ধানে জোর
গ্যাস অনুসন্ধানে সমুদ্র ও স্থল—দুই ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর ইতোমধ্যে বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াতেও রয়েছে। অফশোর ও অনশোর উভয় ক্ষেত্রে গ্যাসের নতুন মজুত পাওয়া গেলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।

২০২৮ সালের মধ্যে বাড়বে এলএনজি আমদানি
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোম এলাকায় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ওই টার্মিনাল দিয়ে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একদিকে কওমি শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও চাকরির সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে—এমনটাই সরকারের প্রত্যাশা।

এম/এএইচ


সম্পর্কিত খবর