দেশজুড়ে

বাজার নেই ক্ষেতলালে, সবজি বিক্রিতে বিপাকে কৃষক

জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে মাঠজুড়ে নানা জাতের সবজির সমারোহ। বেগুন, করলা, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন সবজির ভালো ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। স্থানীয়ভাবে বড় কোনো পাইকারি বাজার বা বিপণনকেন্দ্র না থাকায় বাধ্য হয়ে মাঠে আসা পাইকারদের কাছে কম দামে সবজি বিক্রি করছেন কৃষকেরা। কৃষকদের অভিযোগ, একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বিক্রির সময় ন্যায্য দাম মিলছে না। দূরের বাজারে সবজি নিয়ে যেতে পরিবহন খরচ ও সময় বেশি লাগায় সেখানেও লাভের নিশ্চয়তা নেই। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই পাইকারদের প্রস্তাব করা দামে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে। চলতি খরিপ-২ মৌসুমে কম দামে সবজি বিক্রি করে ক্ষেতলালের কৃষকদের প্রায় ৫ কোটি ৫২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে বলে কৃষি-সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে জানা গেছে। রবি মৌসুমেও একই পরিস্থিতি চললে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

মাঠে ৮০০, বাজারে ১ হাজার ৬০০ টাকা
সকাল সাড়ে ৭টা। ক্ষেতলালের ঘুগইল গ্রামের মাঠে সারি সারি বেগুন, শিম, ফুলকপি ও বাঁধাকপির গাছ। ভোরে জমি থেকে সবজি তুলছিলেন কৃষক আব্দুল কাদের। এক পাশে স্তূপ করে রাখা করলা। কিছুক্ষণ পর ভ্যান নিয়ে সেখানে হাজির হন স্থানীয় পাইকার মিরাজুল ইসলাম। শুরু হয় দরদাম। কৃষক আব্দুল কাদের প্রতি কেজি করলার দাম চেয়েছিলেন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। কিন্তু পাইকার প্রস্তাব দেন ১৮ থেকে ২০ টাকা। শেষ পর্যন্ত ২০ টাকা কেজি দরেই সবজি বিক্রি করতে হয় তাঁকে। আব্দুল কাদের বলেন, কাছাকাছি কোনো বড় বাজার নেই। দূরের বাজারে সবজি নিয়ে গেলে পরিবহন খরচ, সময় এবং বিক্রি না হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই যা দাম পাওয়া যায়, মাঠ থেকেই বিক্রি করে দিতে হয়। শুধু আব্দুল কাদের নন, ক্ষেতলালের বিভিন্ন এলাকার সবজিচাষিদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারজাতকরণের সুযোগ সীমিত থাকায় নিজেদের পছন্দমতো দাম নির্ধারণ করতে পারছেন না তাঁরা।

সবজি চাষে জমির পরিমাণ বাড়ছে
ক্ষেতলাল উপজেলায় মোট ফসলি জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৪০০ হেক্টর। এর মধ্যে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ১০ হাজার ৮৬০ হেক্টর। ধান কাটার পর ৮ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আলু এবং ৬১০ হেক্টর জমিতে শাকসবজিসহ অন্যান্য রবি ফসল চাষ করা হয়। চলতি খরিপ-২ মৌসুমে উপজেলার ৩৭০ হেক্টর জমিতে সবজি আবাদ হয়েছে। রবি মৌসুমে আরও ২৪০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের প্রস্তুতি চলছে। এবার করলা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেশি। এ সবজি চাষ হয়েছে ৭০ হেক্টর জমিতে। একই পরিমাণ জমিতে বেগুন চাষ করা হয়েছে। এ ছাড়া চিচিঙ্গা ১৫ হেক্টর, পটোল ১৫ হেক্টর, ফুলকপি ৫ হেক্টর, বাঁধাকপি ৫ হেক্টর, মুলা ১৫ হেক্টর, ঢ্যাঁড়শ ১০ হেক্টর, লাউ ১৫ হেক্টর এবং টমেটো ২০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।

উৎপাদন খরচ বাড়লেও মিলছে না ন্যায্যমূল্য
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতি মণ করলা বিক্রি হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার টাকায়। এবার তা কমে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। প্রতি মণ বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। অন্যান্য সবজির দামও তুলনামূলক কম। অথচ স্থানীয় বাজারে করলা ও বেগুনের খুচরা দাম প্রায় ৪০ টাকা কেজি। সে হিসাবে প্রতি মণের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। উৎপাদক পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দামের এই ব্যবধান নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। তাঁদের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক মুনাফা ঠেকাতে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। ক্ষেতলালের নশিরপুর গ্রামের করলাচাষি শাহাজুল ইসলাম বলেন, ৯০ থেকে ১২০ দিন মেয়াদি সবজি উৎপাদনে জমি প্রস্তুত, রাসায়নিক ও জৈব সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, সেচ ও পরিবহনসহ বিঘাপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। জমির ধরন ও চাষপদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে এ খরচ কমবেশি হয়।

তিনি বলেন, সবজি বিক্রির জন্য এলাকায় কোনো আড়ত বা বড় বাজার নেই। বাধ্য হয়ে ক্ষেত থেকেই পাইকারদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়। প্রতি মণ করলা ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি করে উৎপাদন খরচ বাদে সামান্যই থাকে। তিন মাসের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের তুলনায় এই আয় খুবই কম। ঘুগইল গ্রামের কৃষক আলিমদ্দিন বলেন, এবার শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। সারও ন্যায্যমূল্যে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সবজির দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি জানান, ২৫ শতক জমিতে সবজি চাষে তাঁর প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত সবজি বিক্রি করে পেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। আরও এক মাস করলা তোলা যাবে। চাহিদা ও দাম বাড়লে হয়তো উৎপাদন খরচ উঠে সামান্য লাভ থাকতে পারে। এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে লোকসানের একটি হিসাব করা হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লোকসান হলে প্রতি হেক্টরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৫০ টাকা থেকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪০০ টাকা। সেই হিসাবে খরিপ-২ মৌসুমে ৩৭০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করে মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ১৪ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫ কোটি ৫২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে বিক্রি করতে হয় সবজি
ক্ষেতলালে উৎপাদিত সবজি বিক্রির জন্য কৃষকদের নির্ভর করতে হয় মাঠে আসা পাইকারদের ওপর। বিকল্প হিসেবে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বগুড়ার মহাস্থান বাজারে সবজি নিয়ে যেতে হয়। এতে পরিবহন ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি ও সময়ের কারণে লাভের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। পাঁচুইল গ্রামের সবুজ আকন্দ ৭০ শতক জমি ১২ মাসের জন্য ৭০ হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে বেগুন ও তরমুজ চাষ করেছেন। বেগুনের ফলন ভালো হলেও স্থানীয়ভাবে পাইকারি বাজার না থাকায় তাঁকে সবজি বিক্রি করতে যেতে হয় মহাস্থান বন্দরে।

সবুজ আকন্দ বলেন, প্রতি মণ সবজি পরিবহনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এক বিঘা জমিতে ৮০ মণ সবজি উৎপাদন হলে দূরের বাজারে নিতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পরিবহন খরচ হয়। এতে লাভের বড় অংশই ভাড়া দিতে চলে যায়। ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী আমিনুর ইসলাম বলেন, ক্ষেতলালের সবজির মান ভালো। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার আড়তে এসব সবজির চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু বড় বাজার না থাকায় তাঁদের সরাসরি কৃষকের ক্ষেত থেকে সবজি কিনে ঢাকা ও অন্যান্য জেলা শহরে পাঠাতে হয়।

গাজীপুর থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী নাজমুল হোসেন বলেন, নির্দিষ্ট কেনাবেচার বাজার না থাকায় তাঁদের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে সবজি সংগ্রহ করতে হয়। সব গ্রামে ট্রাক নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে অটোভ্যানে করে সবজি পাকা সড়কে এনে ট্রাকে তুলতে বাড়তি খরচ হয়। প্রত্যন্ত এলাকায় সবজি সংগ্রহের শ্রমিকও সব সময় পাওয়া যায় না। এতে নির্ধারিত সময়ে মোকামে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও কখনও কম দামেও পণ্য বিক্রি করতে হয়।

মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভ, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
ক্ষেতলাল উপজেলায় মোট ১৫টি হাট-বাজার রয়েছে। এর মধ্যে হোপের হাট, উত্তরহাটশহর হাট, ফুলদীঘিহাট, মধুপুকুর হাট, চৌমুহনী হাট, মনঝার হাট ও লালাগর হাট সরকারি ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পৌর এলাকায় ইটাখোলা ও ক্ষেতলাল সদর কাচারিসহ তিনটি হাট-বাজার রয়েছে। এসব বাজারে কৃষিপণ্য কেনাবেচার ব্যবস্থা থাকলেও নির্ধারিত হাটের দিন খুচরা বিক্রির বাইরে নিয়মিত পাইকারি বেচাকেনা হয় না। ফলে মাঠ থেকে সবজি কিনে বিভিন্ন বাজারে সরবরাহের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে বাণিজ্যিকভাবে সবজি কেনাবেচার উপযুক্ত কেন্দ্র না থাকায় সরকারের রাজস্ব আদায়ের সুযোগও সীমিত হচ্ছে।

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকার কারণে কৃষকের সম্ভাব্য লাভের একটি অংশ অন্যদের হাতে চলে যাচ্ছে। এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে নিয়মিত বাজার মনিটর করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক জাকির মুন্সী বলেন, সমস্যা সমাধানে সবজি উৎপাদনকারী কৃষক, পাইকারি ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি স্থায়ী সবজির বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রশিক্ষণ-প্রণোদনা আছে, পিছিয়ে বাজারব্যবস্থা
খোরপোষ কৃষিকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর এবং নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ক্ষেতলালে পার্টনার প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ১৭টি ফিল্ড স্কুলে ২৫ জন করে মোট ৪২৫ জন কিষান-কিষানিকে শাকসবজি চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরা আধুনিক পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল জাতের সবজি চাষ করছেন। এ ছাড়া কৃষি অফিসের মাধ্যমে ৪১০ জন কিষান-কিষানিকে প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৫০ জন কৃষককে মাঠে এবং ১৬০ জন কিষানিকে বসতবাড়ির আশপাশে সবজি চাষের জন্য বিনা মূল্যে বিভিন্ন জাতের ৫০০ গ্রাম বীজ এবং ২০ কেজি করে টিএসপি ও এমওপি সার দেওয়া হয়েছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে। তবে উৎপাদন বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া হলেও উৎপাদিত সবজি ন্যায্যমূল্যে বিক্রির উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় কৃষকদের সমস্যা কাটছে না। উৎপাদন বাড়লেও দুর্বল বাজারব্যবস্থার কারণে এর সুফল কৃষকের ঘরে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা নেই।

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, উপজেলার ফুলদীঘি বাজারে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কৃষিপণ্য কেনাবেচার সুবিধার্থে সরকারিভাবে একটি গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে মূলত ধান কেনাবেচা হয়। বাজারটি সবজি কেনাবেচার উপযোগী করে গড়ে তোলা গেলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জসিম উদ্দীন বলেন, ফসলের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদিত সবজির সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয়ভাবে একটি সবজির বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ক্ষেতলালের কৃষকেরা এখন উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার অপেক্ষায়। তাঁদের মতে, স্থায়ী পাইকারি বাজার, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা ও কার্যকর বাজার তদারকি গড়ে উঠলে উৎপাদিত সবজির প্রকৃত মূল্য তাঁদের হাতে পৌঁছাতে পারে।

সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর