এক্সক্লুসিভ

শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে আ.লীগের ১৫০ নেতাকর্মীর উসকানি, উত্তপ্ত পোশাকশিল্পাঞ্চল

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের প্রধান শিল্পাঞ্চল। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়কে নেমে বিক্ষোভ, অবরোধ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিকরা। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। কোথাও যানবাহন ভাঙচুর, কোথাও পুলিশের গাড়ি ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

  • মিরপুরে ডিবির অভিযানে ইলিয়াস মোল্লার ভাগনেসহ গ্রেপ্তার ১১, সহিংসতায় হেফাজতে ২০
  • গাজীপুরে পুলিশ বক্স ও মোটরসাইকেলে আগুন, আহত ৭-৮ পুলিশ সদস্য; বন্ধ প্রায় ৬০০ কারখানা

এদিকে, শ্রমিকদের স্বাভাবিক আন্দোলনের আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী উসকানি দিয়ে পরিস্থিতি সহিংস করার চেষ্টা করছিলেন বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরসহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। এ ঘটনায় মিরপুরে অভিযান চালিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লাসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে দেশের পোশাকশিল্পে বড় ধরনের উৎপাদন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, রোববার প্রায় ৬০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। সাভারে ১৭৭টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে ১২০-১৫০ নেতাকর্মীর তৎপরতা, ডিবির হাতে ১১ জন
মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মী সক্রিয় ছিলেন বলে জানিয়েছে ডিবি। শ্রমিকদের সাধারণ আন্দোলনের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাঁরা পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছিলেন। যানবাহনে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনাও ছিল তাঁদের।

ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, মিরপুর-১২ নম্বরের মোল্লা মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা রয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সংগঠনগুলোর তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। তাঁদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধার বাসিন্দা রয়েছেন।

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীরা পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছিলেন। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের মতো কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা নিয়ে তাঁরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন। যথাসময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে সহিংসতা আরও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারত। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ভিডিও ফুটেজেও বিভিন্ন কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিবি। এসব ফুটেজে গেরিলা-৭১, ধানমন্ডি ৩২-সহ বিভিন্ন স্থানের কর্মকাণ্ডের দৃশ্য রয়েছে বলে সংস্থাটি দাবি করেছে।

মিরপুরে সহিংসতায় ২০ জন হেফাজতে
মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় মোট ২০ জনকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। রোববার সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরিচয় যাচাইয়ের কাজ চলছে। পুলিশের ধারণা, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কিছু কর্মী পোশাকশ্রমিকদের স্বাভাবিক আন্দোলনের সঙ্গে মিশে গিয়ে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন।

কোনাবাড়ী-মৌচাকে পুলিশ বক্সে আগুন, আহত ৭-৮ সদস্য
গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার সকালে কাজে যোগ না দিয়ে শত শত পোশাকশ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন।

পুলিশ ও শ্রমিক সূত্রে জানা যায়, এসব এলাকায় কয়েক দিন ধরেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চলছিল। এর ধারাবাহিকতায় রোববার সকালে শ্রমিকরা কর্মস্থলে না গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে কোনাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে থাকা একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। এ সময় বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশের একটি মোটরসাইকেলেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষ ও সহিংসতায় ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে সড়ক অবরোধ
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে মিরপুরের ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেকশনসহ আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকরা। একই দাবিতে সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। সকালের দিকে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও দুপুরের পর সাভারের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামানো হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় সাভারের অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, নিরাপত্তাঝুঁকি ও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে সাভার ও গাজীপুরের আরও বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

সাভার-গাজীপুরে কারখানায় ছুটি, উৎপাদন ব্যাহত
শ্রমিক অসন্তোষের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পোশাকশিল্পের উৎপাদনে। সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের অনুপস্থিতি, বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। কোথাও শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে, কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে কারখানা বন্ধ রাখা হয়। সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৮০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, বিজিএমইএর হিসাবে রোববার সারা দেশে প্রায় ৬০০টি কারখানা বন্ধ ছিল। সাভারে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে ১৭৭টি পোশাক কারখানায়।

ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন
শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার (১ নভেম্বর) শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নতুন বেতন নির্ধারণে এই বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত বোর্ডটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এর আগে বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার।

বৈঠক শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের সভা আয়োজন করে শ্রমিকদের বেতনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বানের পরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। শ্রমিকদের দাবি পূরণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় আন্দোলন থেকে সরে আসেননি অনেক শ্রমিক।

কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারি বিজিএমইএর
শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে পোশাক কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। রোববার সন্ধ্যায় তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দিনভর শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, এদিন প্রায় ৬০০টি কারখানা বন্ধ ছিল। সাভারেও ১৭৭টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পরদিন থেকে কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ন্যায্য মজুরির দাবি, সহিংসতা ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে বড় ধরনের অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, কালো তালিকাভুক্তি ও ছাঁটাই বন্ধের দাবি; অন্যদিকে আন্দোলনের মধ্যে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং নাশকতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে শ্রমিকদের সাধারণ আন্দোলনের আড়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১২০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মীর উসকানির বিষয়ে ডিবির বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার এবং মিরপুরে সহিংসতার ঘটনায় ২০ জনকে হেফাজতে নেওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও শ্রমিকদের দাবির চূড়ান্ত সমাধান এখনো আসেনি।

অন্যদিকে, অব্যাহত অস্থিরতায় শত শত কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় পোশাকশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম, রপ্তানি ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন সরকারের সামনে একদিকে শ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবির কার্যকর সমাধান, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জ।

সন্ধানী বার্তা/ওয়াইএ/এমকে


সম্পর্কিত খবর