মৌলভীবাজার পৌর শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া একসময়ের খরস্রোতা মনু নদ এখন দখল ও দূষণের চাপে বিপর্যস্ত। অব্যাহত দখলে কমেছে নদীর নাব্যতা, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনা ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলার কারণে দূষিত হচ্ছে পানি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। একসময়ের প্রাণচঞ্চল নদটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন জলধারায়। নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্জ্য অপসারণ এবং নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার দাবি দীর্ঘদিনের। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় আবারও দখল ও দূষণ বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি
সরেজমিনে দেখা গেছে, মনু নদ মৌলভীবাজার পৌর শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। শহরের দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগের জন্য নদটির ওপর অন্তত তিনটি সেতু রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে একটি বাঁশের সাঁকো। এসব সেতুর মধ্যে চাঁদনীঘাট সেতু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শহরের অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন প্রধান সড়কে যাতায়াতের জন্য এই সেতু ব্যবহার করেন। চাঁদনীঘাট সেতুর উত্তর-পূর্ব পাশে রয়েছে কাঁচাবাজার। বাজারের ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত নদে ফেলা হচ্ছে। শুধু বাজার এলাকাই নয়, শহরের ভেতরে নদটির বিভিন্ন স্থানে জমে রয়েছে নানা ধরনের বর্জ্য। এতে নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। চাঁদনীঘাট সেতুর পশ্চিম-উত্তর পাশে মনু নদের বাঁধের ভেতরে একাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কাজও চলছে। ফলে নদীর তীর দখল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—দুই দিক থেকেই সংকট বাড়ছে।
দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ বাসিন্দারা
চাঁদনীঘাট সেতুসংলগ্ন এলাকার ব্যবসায়ী তানভীর বলেন, নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। নোংরা পরিবেশে মশা-মাছির উপদ্রবও বেড়েছে। মাঝেমধ্যে নদীতে মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। তিনি জানান, কয়েক বছর আগে প্রশাসন নদীর কিছু এলাকা দখলমুক্ত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়মিত তদারকি না থাকায় সেসব জায়গা আবারও দখল হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশবিদ খসরু চৌধুরী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে মনু নদকে ব্যবহার করা হচ্ছে। দিনের পর দিন যেভাবে নদটিতে দখল ও দূষণ চলছে, তা উদ্বেগজনক। বর্তমানে নদীর পানি আর ব্যবহার করার মতো অবস্থায় নেই। তিনি বলেন, একসময় শহরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্নানের ঘাট ছিল। কিন্তু দখলের কারণে সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। চাঁদনীঘাট মনু সেতুর পাশে সৈয়ারপুর এলাকার একটি ঘাট ছাড়া বাকি ঘাটগুলো দখল হয়ে গেছে। নদটি সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হলে তা শহরবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
হারিয়ে যাচ্ছে নৌযান চলাচলের পুরোনো ঐতিহ্য
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার অংশে মনু নদের দৈর্ঘ্য ৭৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে পৌর শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে প্রায় ছয় কিলোমিটার। শহরের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুস শহীদ (৬৫) বলেন, একসময় মনু নদ ছিল খরস্রোতা ও প্রাণচঞ্চল। নদীতে জোয়ার-ভাটার মতো পানির প্রবাহ দেখা যেত। বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় মহাজনি নৌকা আসত। পালতোলা নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চের চলাচলে মুখর থাকত নদটি। তবে প্রায় তিন দশক ধরে বড় নৌযানের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে নদটি আগের রূপ হারিয়েছে। একসময় যে নদ ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, সেটি এখন নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
পৌর শহরের বাসিন্দা প্রবীণ সাংবাদিক মামুনূর রশীদ বলেন, দখল ও দূষণের কারণে মনু নদ এখন বিপন্ন। গৃহস্থালি বর্জ্যসহ নানা ধরনের আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। যারা নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নদী রক্ষায় শুধু মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথা পাউবোর
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন ওয়ালীদ বলেন, মনু নদের বাঁধের ভেতরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক জায়গা আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। তাই নদীর তীর দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে। একসময়ের খরস্রোতা মনু নদকে রক্ষা করতে হলে দখল ও দূষণ—দুই সমস্যারই স্থায়ী সমাধান জরুরি। অন্যথায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আরও হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সন্ধানী বার্তা/এএইচ/এমএসআইপি