স্রেফ একটি ধারণা আর পাঁচজন সদস্যকে নিয়ে ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করেছিল ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ‘ইউআইইউ এরিয়াল রোবোটিকস টিম’ (ইউআরটি)। দুই বছরের ব্যবধানে সেই দলই আন্তর্জাতিক ড্রোন প্রতিযোগিতায় বড় সাফল্য পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা রোবোনেশন আয়োজিত ‘স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস ২০২৬’ প্রতিযোগিতায় ৬৫১ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ হয়েছে ইউআইইউর শিক্ষার্থীদের দল। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার টালসায় স্কাইওয়ে রেঞ্জে ১৪ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতাটির চূড়ান্ত পর্ব।
ইউআইইউর দলটির এই সাফল্যের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন দলের জনসংযোগ ও বিপণন বিভাগের প্রধান মাইসুন জহির।
লক্ষ্য ছিল বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরা
২০২৪ সালে টি এম আল আনামসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীর উদ্যোগে এবং অধ্যাপক এ কে এম মুজাহিদুল ইসলামের সহায়তায় ইউআরটির যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকেই দলের লক্ষ্য ছিল আনম্যানড এরিয়াল রোবোটিকস প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
শুরুর দিকে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরিকল্পনা থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় হার্ডওয়্যার উন্নয়ন ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের কাজ।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউআইইউ ক্যাম্পাসে নিজস্ব ল্যাবরেটরির জন্য জায়গা পাওয়ার পর দলের কার্যক্রমে আসে বড় পরিবর্তন। নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে দলটি ২২ জনের একটি শক্তিশালী দলে পরিণত হয়।
মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সফটওয়্যার অ্যান্ড নেভিগেশন, কমিউনিকেশন, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং জনসংযোগ ও বিপণন (পিআর অ্যান্ড মার্কেটিং)—ছয়টি উপদলে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
তৈরি হয় স্বয়ংক্রিয় ড্রোন
দলের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার টালসায় অনুষ্ঠিত রোবোনেশনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস ২০২৬’-এ অংশ নেওয়া।
অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন, এমবেডেড সিস্টেম ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমন্বয়ে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতার জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি স্বয়ংক্রিয় ড্রোন তৈরি করতে মাসের পর মাস কাজ করেন ইউআইইউর শিক্ষার্থীরা।
ড্রোনটিতে যুক্ত করা হয় পূর্বনির্ধারিত মিশন রুট অনুসরণের জন্য স্বায়ত্তশাসিত নেভিগেশন ব্যবস্থা। ভৌগোলিক তথ্য ও ছবি সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয় এরিয়াল ম্যাপিং প্রযুক্তি। বস্তু শনাক্তকরণের জন্য যুক্ত করা হয় কম্পিউটার ভিশন ও ডেটাসেট মডেল। পাশাপাশি সেন্সিং সিস্টেমের মাধ্যমে বাধা শনাক্ত ও এড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়।
ল্যাবে রাত জেগে প্রস্তুতি
প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় ল্যাবে কাজ করতে হয়েছে। দলের সদস্যরা দিনের পাশাপাশি রাতেও কাজ করেছেন। দলের নারী সদস্যরা বাসায় ফেরার পরও গুগল মিটে যুক্ত থেকে কাজ চালিয়ে গেছেন।
প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকেরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের মুখোমুখি করেছেন এবং প্রকল্পের বিভিন্ন ঘাটতি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সহায়তা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত আট সদস্যের একটি দলের সামনেও ইউআইইউর দলকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতার আগে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাই করার সুযোগ পান তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পেরেছিলেন পাঁচজন
১৪ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে ইউআইইউর পাঁচজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পেরেছিলেন। ভিসার নতুন নিয়মকানুনের কারণে দলের সব সদস্যের যাওয়া সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পাঁচজন হলেন কো-টিম লিড আহমেদ জুনায়েদ, মেকানিক্যাল টিমের মুক্তাদিরুল ইসলাম ও দিগন্ত কর্মকার, নেভিগেশন লিড ফাহাদ রহমান এবং কমিউনিকেশন লিড ইফতা ফয়সাল। দলের মেন্টর হিসেবে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন রিয়াসাত আজিম।
তবে সশরীরে পাঁচজন যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও বাংলাদেশে থাকা দলের অন্য সদস্যরা প্রতিযোগিতার পুরো সময় তাঁদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রভাষক আজিজুর রহমানের দিকনির্দেশনায় সময়ের পার্থক্য সামলে গুগল মিটের মাধ্যমে তাঁরা দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
প্রতিযোগিতার আগে বড় ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরও দলটিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি ও চাপের কারণে দলের প্রতিযোগীরা তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সুযোগ পাননি।
এর মধ্যেই প্রতিযোগিতার কিছুক্ষণ আগে ড্রোনের ‘পেলোড ড্রপ সিস্টেমে’ ত্রুটি দেখা দেয়। প্রতিযোগিতায় এই অংশের ওপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নম্বর নির্ভর করছিল।
আগের প্রতিযোগিতাগুলোতে ড্রোন ক্র্যাশ করার অভিজ্ঞতাও ছিল দলের। ফলে শেষ মুহূর্তের এই ত্রুটিতে স্বাভাবিকভাবেই চাপ আরও বেড়ে যায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রতিযোগী সদস্য এবং বাংলাদেশে থাকা দলের অন্য সদস্যরা একটানা কাজ করে সমস্যাটি সমাধান করতে সক্ষম হন।
বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে লড়াই
এবারের প্রতিযোগিতায় বিশ্বজুড়ে ৮৫টি দল নিবন্ধন করেছিল। সেখান থেকে বাছাই করা ১০ দেশের ৬৪টি দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইউআইইউ।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের দল। এর মধ্যে ছিল কর্নেল ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া টেক, মোনাশ ইউনিভার্সিটি ও ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান।
প্রথমবারের মতো এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ইউআইইউর দলকে বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়।
ফল ঘোষণার সেই মুহূর্ত
ফল ঘোষণার সময় বাংলাদেশে তখন ভোর ৪টা ২৬ মিনিট। ইউআইইউর দলের সদস্যরা সবাই গুগল মিটে যুক্ত হয়ে ফল ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলেন।
একপর্যায়ে চতুর্থ স্থান হিসেবে ইউআইইউর নাম ঘোষণা করা হয়। দলের সদস্যদের কাছে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে বিশেষ স্মরণীয়।
‘মিশন ডেমোনস্ট্রেশনে’ ৬৫১ পয়েন্ট অর্জন করে বিশ্বে চতুর্থ স্থান নিশ্চিত করে ইউআইইউ। প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েই এমন ফলাফল দলটির ভবিষ্যৎ কাজের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুই বছর আগে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু হওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক দল এভাবেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ইউআইইউর শিক্ষার্থীদের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের তরুণদের আনম্যানড এরিয়াল রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণায় আরও আগ্রহী করে তুলতে পারে।
সন্ধানী বার্তা/এসএ