এক্সক্লুসিভ

বাঁশের সেতু বিদায়, খাল-নদীতে ফিরবে প্রাণ

ঢাকার খালপাড়ের বাঁশের সেতুগুলো এবার স্থায়ীভাবে বিদায় নেওয়ার পথে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থাকা বাঁশের সেতু পর্যায়ক্রমে আরসিসিতে রূপান্তর করা হবে। একই সঙ্গে খাল দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও অনুমোদনহীন সেতুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৫৫টি খাল পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, পাঁচ নদীকে পুরোনো নাব্যতায় ফেরানো এবং স্যুয়ারেজের বর্জ্য শোধন করে নদীতে পরিষ্কার পানি ছাড়ার সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

  • ৫৫ খাল ও পাঁচ নদী ঘিরে ঢাকাকে বদলে দেওয়ার কর্মযজ্ঞ
  • আরসিসি সেতু, ওয়াকওয়ে ও রিটেইনিং ওয়ালে দখল রোধ
  • স্যুয়ারেজ শোধনে দূষণমুক্তির পরিকল্পনা

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘোষণায় উঠে এসেছে রাজধানীর জলপথ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে সরকারের এই নতুন কর্মপরিকল্পনা। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ত্রিমোহনী খাল ব্রিজ এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জিরানি খাল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকায় কোনো বাঁশের সেতু থাকবে না। ত্রিমোহনী এলাকার বাঁশের সেতুটিও অল্পদিনের মধ্যে আরসিসি সেতুতে রূপান্তর করা হবে।

‘ঢাকায় কোনো বাঁশের সেতু থাকবে না’
বাঁশের সাঁকো রাজধানীর কিছু এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের চলাচলের ভরসা হলেও নগর অবকাঠামোর স্থায়ী সমাধান নয়। সেই বাস্তবতায় বাঁশের সেতুর পরিবর্তে আরসিসি সেতু নির্মাণকে নিরাপদ ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে সরকার।

মীর শাহে আলম বলেন, শুষ্ক মৌসুমের মধ্যেই খালগুলোর চলমান কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হবে। এতে মানুষের চলাচলের সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি খালের পানিপ্রবাহ সচল করে জলাবদ্ধতা নিরসনের পথও সহজ হবে। তবে অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে খাল দখলমুক্ত রাখাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা, খাল দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা এবং অবৈধভাবে নির্মিত সেতুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চলতি বছর সব ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৫৫ খালে ফিরবে পানির গতি
ঢাকার জলাবদ্ধতা ও জলপথের সংকট সমাধানে দুই সিটি করপোরেশনের ৫৫টি খালকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বড় পরিকল্পনা। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬টি এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯টি খাল রয়েছে।

মীর শাহে আলম বলেন, এসব খাল পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ সচল করা হবে। খালের দুই পাশে প্রয়োজন অনুযায়ী গাইডওয়াল, রিটেইনিং ওয়াল ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। নেটিংয়ের মাধ্যমে সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি দখল ও দূষণ থেকে খালগুলোকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

জিরানীসহ চার খালে ৮৯৮ কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ
৫৫ খাল ঘিরে বৃহত্তর পরিকল্পনার পাশাপাশি ডিএসসিসির মান্ডা, জিরানী, কালুনগর ও শ্যামপুর খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় পরিদর্শন করা জিরানী খালের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৪ থেকে ২৫ মিটার।

৮৯৮ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের ৭০ শতাংশ সরকার এবং ৩০ শতাংশ ডিএসসিসি বহন করছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ২১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

খালভিত্তিক অগ্রগতির হিসাবে মান্ডা খালের কাজ এগিয়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, জিরানীর ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ, কালুনগরের ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং শ্যামপুরের ২ দশমিক ০৫ শতাংশ।

খালপাড়ে ওয়াকওয়ে, সুরক্ষা বেষ্টনী ও সবুজায়ন
প্রকল্পের আওতায় চারটি খালের প্রায় ২০ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার পুনঃখনন ও স্লাজ অপসারণ করা হবে। একই সঙ্গে খালের সীমানা নির্ধারণ ও স্লোপ প্রটেকশনের কাজ থাকবে। পরিকল্পনায় রয়েছে ৩২ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল, ৩৮ দশমিক ০৬ কিলোমিটার সুরক্ষা বেষ্টনী এবং ৩২ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ। খালপাড়ে ল্যান্ডস্কেপিং ও সবুজায়নের পাশাপাশি পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে আটটি ইটিপি নির্মাণ করা হবে।

ফলে প্রকল্পটি শুধু খনন বা দখলমুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; খালের পানিপ্রবাহ, পাড়ের স্থায়িত্ব, নাগরিক চলাচল এবং পরিবেশ—সবগুলো বিষয়কে একই অবকাঠামোগত পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।

পাঁচ নদীকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য
খালের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের পাঁচ নদী নিয়েও বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মীর শাহে আলম। তাঁর বক্তব্য, নদীগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি পাড় সংরক্ষণে গাইডওয়াল ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণ করা হবে।

নদীগুলোকে ৪০ থেকে ৫০ বছর আগের মতো সচল করে নৌযান চলাচলের উপযোগী করার লক্ষ্য রয়েছে। নদী পুনরুদ্ধারে স্টিমার ও ফেরিতে সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনের কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

স্যুয়ারেজের বর্জ্য যাবে শোধনাগারে
ঢাকার নদী-খাল দূষণের বড় উৎস পয়ঃবর্জ্য। এই সংকট মোকাবিলায় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ঢাকার স্যুয়ারেজ লাইন শহরের বাইরে নিয়ে দাসেরকান্দি, পাগলা, মিরপুর, উত্তরা ও রায়েরবাজার-মাদানীসহ নির্ধারিত স্থানে শোধনাগারের মাধ্যমে পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন করা হবে। এরপর শোধিত পানি নদীতে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।

‘উন্নয়নের গ্যারান্টি দেব’
নগর উন্নয়ন নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, সরকার বেহেশতের গ্যারান্টি দেবে না, তবে উন্নয়নের গ্যারান্টি দেবে। রাস্তাঘাট ঠিক করা, খাল সচল করা এবং স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে দুর্গন্ধমুক্ত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে যাচ্ছে। যেখানে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে, সেখানে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে। জনগণের দেওয়া দায়িত্বকে সম্মান করে আগামী পাঁচ বছর প্রয়োজনীয় কাজ করে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

অন্যরা কে কী বলেছেন?
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, ঢাকায় প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। ফলে নগরে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, নদী, খাল ও জলাশয়ের দুই পাড় গাইডওয়াল দিয়ে সংরক্ষণের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ করা হবে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় শোধন করা হবে।

ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, গত ১৫ বছরে খালগুলো অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। যারা দখল করেছে, তাদের পরিচয় শুধু অবৈধ দখলদার। রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে তাদের বিবেচনা করার সুযোগ নেই। খাল দখলমুক্ত করে এলাকার উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি। বাঁশের সাঁকোগুলো আরসিসি সেতুতে রূপান্তরের কাজও এগিয়ে চলছে বলে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর জলপথ ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনায় ঢাকার দখল, দূষণ ও জলাবদ্ধতার মতো পুরোনো সংকটগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় মোকাবিলার চেষ্টা স্পষ্ট। বাঁশের সেতুর পরিবর্তে স্থায়ী অবকাঠামো, ৫৫ খালে পানিপ্রবাহ, পাঁচ নদীর পুনরুদ্ধার, খালপাড়ে ওয়াকওয়ে ও সবুজায়ন এবং স্যুয়ারেজ শোধন—সব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর জলপথ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পের গতি, দখল উচ্ছেদের ধারাবাহিকতা এবং পুনরায় দখল-দূষণ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থার ওপর।

এমএএএমকে


সম্পর্কিত খবর