ভ্রমণ

সৌন্দর্য আছে, পর্যটনে পিছিয়ে বাংলাদেশ

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, শ্রীমঙ্গলের বিস্তীর্ণ চা-বাগান কিংবা বান্দরবানের মেঘ-পাহাড়—প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলাদেশের রয়েছে অনন্য সম্পদ। সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী ও গ্রামীণ জনপদের বৈচিত্র্য মিলিয়ে পর্যটনের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির।

তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থাকার পরও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে যেমন বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তেমনি নানা হয়রানি, অতিরিক্ত খরচ ও সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে দেশের পর্যটকেরাও অনেক সময় বিদেশমুখী হচ্ছেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। প্রতিবেশী অনেক দেশ যেখানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, সেখানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে নগণ্য।

পর্যটনকেন্দ্রে বাড়তি খরচের চাপ

দেশের পর্যটন খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে অতিরিক্ত খরচ। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন কিংবা বান্দরবানের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে ছুটির মৌসুমে ভ্রমণ করতে পরিবহন, আবাসন ও খাবারের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা অনেক সময় বিদেশে ভ্রমণের খরচের কাছাকাছি চলে যায়।

পরিবহন ভাড়া, হোটেলের কক্ষের মূল্য এবং খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে স্থানীয় পর্যায়ের অতিরিক্ত চার্জ ও নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।

ফলে অনেক পর্যটকের কাছে দেশের ভেতরে ভ্রমণের তুলনায় ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড কিংবা মালদ্বীপের মতো দেশে ভ্রমণকে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। এতে দেশের পর্যটন খাতে ব্যয় হওয়ার সম্ভাব্য অর্থের একটি অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

নিয়মের বেড়াজালেও পর্যটকের ভোগান্তি

কিছু পর্যটন এলাকায় বিভিন্ন নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা নিয়েও পর্যটকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বান্দরবানের বগালেক কিংবা কেওক্রাডংয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে পাকা সড়ক তৈরি হলেও বাধ্যতামূলকভাবে গাইড নেওয়ার নিয়ম রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু গাইডের পারিশ্রমিক নয়, অনেক ক্ষেত্রে গাইড ও গাড়িচালকের থাকা-খাওয়ার খরচও পর্যটকদের বহন করতে হয়। ফলে ভ্রমণের মোট ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

পর্যটন ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার জন্য কিছু নিয়ম প্রয়োজন হলেও পর্যটকদের অভিযোগ, এসব নিয়ম বাস্তবায়নের পদ্ধতি অনেক সময় ভ্রমণকারীদের ওপর বাড়তি আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করে।

নদীভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগেনি

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য নদ-নদী, চর ও জলাভূমি রয়েছে। নদীকে কেন্দ্র করে নৌভ্রমণ, পর্যটনকেন্দ্র ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে নতুন পর্যটন পণ্য তৈরির বড় সুযোগ রয়েছে।

তবে সঠিক পরিকল্পনার অভাব, নদীদূষণ, দখল ও ভরাটের কারণে নদীভিত্তিক পর্যটনের সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে দেশের প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে নতুন গন্তব্য তৈরি করা সম্ভব।

নারীবান্ধব পর্যটন পরিবেশের ঘাটতি

দেশের পর্যটন খাতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা। বিশেষ করে নারী ও পরিবার নিয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ এখনো অনেক পর্যটনকেন্দ্রে নিশ্চিত করা যায়নি।

নিরাপত্তার অভাব, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটকদের প্রতি অসচেতন আচরণের কারণে কক্সবাজার, সিলেটের মতো পরিচিত কয়েকটি গন্তব্যের বাইরে অনেক স্থান পরিবার ও নারী পর্যটকদের কাছে তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

পর্যটন খাতের উন্নয়নে তাই শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরার ঘাটতি

বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা প্রচার ও ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বৈশ্বিক পর্যটন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণগুলোকে পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরার জন্য সমন্বিত প্রচারণার ঘাটতি রয়েছে।

বিদেশি ট্রাভেল এজেন্সি ও পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছানোর মতো সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও পর্যাপ্ত নয়।

ফলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বড় অংশের কাছে দেশটির পর্যটন সম্ভাবনা যথেষ্ট পরিচিত নয়।

নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রভাব

বিদেশি পর্যটকদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নেতিবাচক খবর অনেক সময় বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

বিভিন্ন দেশের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরিতেও কোনো কোনো সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সতর্কতা দেওয়া হয়। এসব বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যটকের ভ্রমণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আবাসন ও খাবারের খরচ। পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মানসম্মত হোটেল ও খাবারের মূল্য বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলনামূলক বেশি মনে হতে পারে।

নেই নির্দিষ্ট এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন

বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা, বিনোদন ও বিশেষায়িত সেবার কথা বিবেচনা করে কক্সবাজারসহ দেশের বড় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ গড়ে ওঠেনি।

একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আবাসন, বিনোদন, খাবার, সাংস্কৃতিক আয়োজন, নিরাপত্তা ও পর্যটনসেবা সমন্বিতভাবে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ আরও সহজ ও আকর্ষণীয় হতে পারে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত, লোকজ ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে বিদেশি পর্যটকদের সামনে পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরার ব্যবস্থাও বাড়ানো প্রয়োজন।

সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বড় পদক্ষেপের প্রয়োজন

বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, লোকজ সংস্কৃতি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র ও বন—সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য দেশের সম্পদের অভাব নেই।

তবে এই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে শুধু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত সেবা এবং কার্যকর প্রচারণা।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, পরিবহন ও আবাসন খাতে যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পর্যটন পুলিশের সক্ষমতা বাড়িয়ে পর্যটকদের যেকোনো সমস্যায় দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নারী ও পরিবারবান্ধব পর্যটন পরিবেশ তৈরি, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং জোরদার করাও জরুরি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাংলাদেশের বড় সম্পদ। এখন সেই সম্পদকে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়াই দেশের পর্যটন খাতের বড় চ্যালেঞ্জ।

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর