দক্ষিণ কোরিয়ার দেগুতে ৯ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কোরিয়া আন্তর্জাতিক পানি সপ্তাহ ২০২৬ (কেআইডব্লিউডব্লিউ)’। কোরিয়া ওয়াটার ফোরামের আয়োজনে এবং দেশটির জলবায়ু, জ্বালানি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক, সরকারি প্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও পানিসম্পদ খাতের পেশাজীবীরা অংশ নেন। আয়োজকদের হিসাবে, এবারের আয়োজনে প্রায় ১২ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন।
এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘ওয়াটার, এনার্জি, এআই: সিকিউরিং আওয়ার ফিউচার’ বা ‘পানি, শক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আমাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা’।
আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার চ্যালেঞ্জ’। সেখানেই বাংলাদেশের তরুণ গবেষক জাবীর জারিফ আখতার অর্জন করেছেন ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’।
একাই একটি দল, তবু বিশ্বমঞ্চে সাফল্য
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জমা পড়া অসংখ্য আবেদনের মধ্য থেকে ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার চ্যালেঞ্জ’-এর চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পেয়েছিল মাত্র আটটি দল। সেখান থেকে দুটি দলকে দেওয়া হয় ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’। পুরস্কার পাওয়া দুই দলের একটিতে ছিলেন ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি জাবীর জারিফ আখতার।
আয়োজনে ‘দল’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও জারিফের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। তিনি কার্যত একাই তাঁর দলের সদস্য হিসেবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
কেআইডব্লিউডব্লিউর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, অপর পুরস্কারজয়ী দলে ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের প্রতিনিধিরা।
পানিদূষণ শনাক্তে ‘নগরপ্রহরী’
‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার চ্যালেঞ্জ’-এ পানিসংক্রান্ত জটিল সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান উপস্থাপন করতে হয় অংশগ্রহণকারীদের। জারিফ সেখানে উপস্থাপন করেছেন ‘আরবানসেন্টিনেল’ নামের একটি প্রযুক্তিগত সমাধান।
সহজভাবে বলতে গেলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরের পানি সরবরাহব্যবস্থায় দূষণ শনাক্ত করা, দূষণের উৎস চিহ্নিত করা এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে সেই পানি শোধনের ব্যবস্থা করা যায়—এই ধারণাই তুলে ধরেছেন তিনি।
জারিফের পরিকল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক হলেও প্রচলিত অনেক এআই মডেলের মতো দূরের বড় সার্ভারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও পুরো প্রোগ্রাম ও মেশিন লার্নিং মডেলটি ডিভাইসের ভেতরেই যুক্ত থাকে।
দুর্যোগেও কাজ করবে অফলাইন প্রযুক্তি
উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের শহরগুলোতে পানি সরবরাহব্যবস্থার দূষণ নিয়ন্ত্রণে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করেন জারিফ।
বিশেষ করে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পানি সরবরাহব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়লেও তাঁর প্রস্তাবিত প্রযুক্তি কার্যকর থাকার কথা। কারণ, সিস্টেমটি ইন্টারনেট বা দূরবর্তী সার্ভারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে অফলাইন অবস্থাতেও কাজ করতে পারবে।
শহরের পানি সরবরাহব্যবস্থায় দ্রুত দূষণ শনাক্ত করা এবং দূষণের উৎস সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে বলে ধারণাটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় উপস্থাপন করেন তিনি।
বুয়েটের গবেষক হিসেবেই বিশ্বমঞ্চে
কেআইডব্লিউডব্লিউর ওয়েবসাইটে জারিফের পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজিতে (আইএটি) গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করছেন।
জারিফ জানান, এই প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক হিসেবেই বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তিনি ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার চ্যালেঞ্জ’-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
আন্তর্জাতিক এ প্রতিযোগিতায় নিজের কাজ উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে জারিফ বলেন, তাঁর কাজের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বিচারকদের সামনে তুলে ধরতে হয়েছে। নেটওয়ার্কটি কীভাবে কাজ করে, এর স্থায়িত্ব কতটা, শহুরে পানি সরবরাহব্যবস্থায় এর ব্যবহারিক উপযোগিতা কতটুকু—এমন বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করতে হয়েছে তাঁকে।
এর পাশাপাশি বিচারকদের বিভিন্ন কঠিন প্রশ্নের উত্তরও দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
কয়েক বছর ধরেই পানির গবেষণায়
পানি নিয়ে জারিফের গবেষণার অভিজ্ঞতা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি ‘স্টকহোম জুনিয়র ওয়াটার প্রাইজ’-এ অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে প্রতিযোগিতাটিতে সেরা পাঁচে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।
কয়েক বছর ধরে পানি ও পানিসম্পদ নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন এই সাফল্য পেয়েছেন তরুণ গবেষক।
জারিফের গবেষণায় সার্বিক সহায়তা করেছে বুয়েটের আইএটি ও টেক্সটাইল অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরি। এ ছাড়া গবেষণার বিভিন্ন পরীক্ষামূলক ধাপে সহযোগিতা করেছে বুয়েট এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছেলে জাবীর জারিফ আখতার ২০২৩ সালে বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেন। পরের বছর সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি।
পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সৃজনশীল ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন জারিফ। গান শেখার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং স্কুল পর্যায়ে টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নিয়ে পুরস্কারও পেয়েছেন।
এ ছাড়া নাসার ‘গ্রেট লুনার এক্সপেডিশন ফর এভরিওয়ান’ মিশনে রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজি লিড হিসেবেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
গবেষণার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে কাজের স্বপ্ন
প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন রয়েছে জারিফের। তবে শুধু গবেষণার মধ্যেই নিজের কাজ সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তিনি।
সাধারণ মানুষ যেন প্রযুক্তি ও গবেষণার সুফল বাস্তব জীবনে পান, সেটিও নিশ্চিত করতে চান এই তরুণ গবেষক। এ কারণে পড়াশোনা শেষ করার পর গবেষণার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক পানি চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে পানি, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণায় নিজের কাজের পরিচিতি আরও বিস্তৃত করলেন জাবীর জারিফ আখতার।
সন্ধানী বার্তা/এসএ