দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি। বিদায়ি অক্টোবর মাসে দেশে ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। একই সময়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশের পণ্য রপ্তানিও বেড়েছে ৬ শতাংশ। প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রোববার (১ নভেম্বর) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে আসা ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। প্রতি ডলার ১২৪ টাকা হিসাবে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৬৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
- অক্টোবরে প্রবাসী আয় ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি ১২.১ শতাংশ
- জুলাই-অক্টোবরে রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশ
- প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান পোশাক খাতের
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে গত বছরের একই মাসের তুলনায় চলতি বছরের অক্টোবরে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩১ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
শুধু মাসভিত্তিক হিসাবেই নয়, অর্থবছরের প্রথম চার মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ শতাংশ।
প্রবাসী আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১৬ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে চার মাসে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার বা ৬ শতাংশ।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক
আলোচ্য সময়ে দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বিশেষ করে নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-অক্টোবর সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলারে। মোট রপ্তানিতে নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাকের সম্মিলিত অংশ প্রায় ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৮১ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে এ খাতের প্রভাব এখনো সবচেয়ে বেশি।
পোশাকের বাইরে পাট, চামড়া ও রাসায়নিক পণ্যে অগ্রগতি
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কয়েকটি অপ্রচলিত ও সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এ খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৩৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে রাসায়নিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এ খাতে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ ছাড়া হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পাদুকা রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব খাতের প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
কয়েকটি খাতে রপ্তানি কমেছে
সব খাতে অবশ্য প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকেনি। জুলাই-অক্টোবর সময়ে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে তুলা ও তুলাজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। রপ্তানি খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে এসব পণ্যের নেতিবাচক চিত্র কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর উৎপাদন, বাজার সম্প্রসারণ ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ইতিবাচক বার্তা
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি—দুই প্রধান উৎস থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় বাড়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ছে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধিও দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ের ডলারের বাজারভিত্তিক ও সুষম বিনিময় হার, সরকারি প্রণোদনা এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পদক্ষেপ বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পণ্যের মান উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান জরুরি। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে পাট, চামড়া, রাসায়নিক ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে রপ্তানি আয়ের উৎস আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সন্ধানী বার্তা/এমডিএইচ/এএএন