তথ্যপ্রযুক্তি

রকেট থ্রাস্টারে ছুটবে টেসলার স্পোর্টস কার উৎপাদন শুরু নিয়ে ফের ঘোষণা মাস্কের

বহুবার উৎপাদনের সময়সীমা পিছিয়ে অবশেষে ২০২৮ সালে দ্বিতীয় প্রজন্মের বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার রোডস্টার তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে টেসলা। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা গাড়িটি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হলেও আগের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবারও নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। গত ১৫ অক্টোবরের এক অনুষ্ঠানে নতুন রোডস্টার প্রদর্শন করে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে গাড়িটির একটি আকর্ষণীয় প্রদর্শনীও দেখানো হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় একটি সি-আকৃতির র‍্যাম্প বেয়ে ওপরে ওঠার পর গাড়িটিকে উল্টো অবস্থানে নেওয়া হয়। পরে রকেট বুস্টারের সাহায্যে সেটিকে নিচে নামানো হয়। অনুষ্ঠানে টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক জানান, ২০২৮ সালে গাড়িটির উৎপাদন শুরু হবে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ২০২৮ সালে উৎপাদনে যাচ্ছি। এবার সত্যিই।’

রকেট থ্রাস্টার থাকবে বিশেষ সংস্করণে
দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টারের বিশেষ ‘থ্রাস্ট’ সংস্করণ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে গাড়িপ্রেমীদের মধ্যে। এই সংস্করণ সংরক্ষণের জন্য গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দিতে হবে। এতে ঠান্ডা গ্যাসচালিত থ্রাস্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, যা গাড়িটির গতি ও চলাচলের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে মাস্ক প্রথম রোডস্টারের জন্য ‘স্পেসএক্স’ প্যাকেজের কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাড়িটির চারপাশে প্রায় ১০টি ছোট রকেট থ্রাস্টার বসানো হবে। এগুলোর সাহায্যে ত্বরণ, সর্বোচ্চ গতি, ব্রেকিং এবং বাঁক নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে এসব প্রযুক্তির চূড়ান্ত কার্যকারিতা ও উৎপাদনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যের পাশাপাশি গাড়িটির বাস্তব বাজারজাতকরণের সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রকল্পটি ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।

প্রথম রোডস্টার বদলে দিয়েছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির ধারণা
টেসলার শুরুর দিনগুলোতে প্রথম প্রজন্মের রোডস্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ২০০৮ সালে বাজারে আসা গাড়িটি সীমিত সংখ্যায় তৈরি করা হয়েছিল। লোটাস এলিসের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এ গাড়ি সে সময় বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়। একবার চার্জে প্রায় ২৪৪ মাইল চলার সক্ষমতা ছিল প্রথম রোডস্টারের। সে সময় বৈদ্যুতিক গাড়ির সীমিত পরিসর ও কর্মক্ষমতা নিয়ে যে ধারণা প্রচলিত ছিল, তা বদলাতে গাড়িটি ভূমিকা রাখে। টেসলার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মার্টিন এবারহার্ডের পরিকল্পনায় প্রথম রোডস্টারের ধারণা তৈরি হয়। ইলন মাস্ক ২০০৪ সালে এ প্রকল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কোম্পানিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ করেন। পরবর্তী সময়ে গাড়িটির উৎপাদন তদারকিতেও যুক্ত হন তিনি।

২০১৭ সালে উন্মোচন দ্বিতীয় প্রজন্মের
দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টার প্রথম উন্মোচন করা হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে। সে সময় গাড়িটিকে টেসলার বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির অন্যতম বড় উদ্ভাবন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। মাস্ক একে পেট্রোলচালিত গাড়ির জন্য ‘কঠোর চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তখনই ২০২০ সালে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই অনুষ্ঠানে টেসলার ভারী বৈদ্যুতিক ট্রাক ‘সেমি’ও প্রদর্শন করা হয়। তবে রোডস্টারের মতো সেটির উৎপাদনও প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি।

এক ঘোষণার পর আরেক ঘোষণা
রোডস্টারের উৎপাদন নিয়ে বিলম্ব শুরু হয় ২০২০ সালের আগেই। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু না হলেও গাড়িটি সংরক্ষণের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা চালু থাকে। গাড়িটির সংস্করণভেদে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে টেসলার এক আয়বিষয়ক আলোচনায় মাস্ক বলেছিলেন, পরবর্তী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু হবে। সে সময় করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছিল। একই বছর জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মাস্ক জানান, রোডস্টারের আগে সাইবারট্রাক তৈরি করতে চান তিনি। পরে দীর্ঘ বিলম্বের পর সাইবারট্রাকের উৎপাদন শুরু হলেও রোডস্টার উৎপাদনে যেতে পারেনি। ২০২১ সালের শুরুর দিকে উৎপাদন শুরুর সময়সীমা পিছিয়ে ২০২২ সাল নির্ধারণ করা হয়। পরে তা ২০২৩ সালে গড়ায়। এরপর ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও উৎপাদন পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন মাস্ক।

২০২৮ সালের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত
বারবার সময়সীমা পরিবর্তনের কারণে রোডস্টার নিয়ে টেসলার নতুন ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গাড়িটির প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ থ্রাস্টার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি আগ্রহ তৈরি করলেও উৎপাদন শুরু এবং গ্রাহকদের হাতে গাড়ি পৌঁছানোর বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এবার ২০২৮ সালকে লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন মাস্ক। তবে আগের ঘোষণাগুলোর অভিজ্ঞতায় নতুন সময়সীমা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু হলে এটি টেসলার দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে। অন্যথায় রোডস্টার নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

সন্ধানী বার্তা/আরআইকে/এসএ

 


সম্পর্কিত খবর