তথ্যপ্রযুক্তি

ক্লিক ছাড়াই ফোনে সাইবার হামলা বিজ্ঞাপনের আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তি

অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখার সময় কোনো লিংকে ক্লিক না করলেও স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রে গোপনে স্পাইওয়্যার প্রবেশ করতে পারে। বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীদের যন্ত্রে নজরদারির সফটওয়্যার ছড়িয়ে দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র সিটিজেন ল্যাবের এক অনুসন্ধানে ইসরায়েলভিত্তিক একটি ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিরুদ্ধে এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে।

গবেষকদের তথ্যমতে, এ ধরনের সাইবার হামলায় ব্যবহারকারীর কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন হয় না। বিজ্ঞাপন দেখার সময়ই যন্ত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে স্পাইওয়্যার প্রবেশ করানো সম্ভব। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার কয়েক ডজন যন্ত্র এ ধরনের স্পাইওয়্যারে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপনের আড়ালে স্পাইওয়্যার ছড়ানোর অভিযোগ
সিটিজেন ল্যাবের গবেষকদের ধারণা, ‘ডিসকভার-টেক’ নামের একটি ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে স্পাইওয়্যার ছড়ানো হয়েছে। অনলাইন বিজ্ঞাপনব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাঁদের যন্ত্রে গোপনে নজরদারির সফটওয়্যার প্রবেশ করানোর বিষয়টি নিয়ে গবেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্পাইওয়্যার একধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার, যা ব্যবহারকারীর অজান্তে তাঁর যন্ত্রের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, অনলাইন কার্যক্রম এবং অন্যান্য সংবেদনশীল উপাত্তে অননুমোদিত প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী, এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নজরদারিও চালানো সম্ভব।

সাধারণত সাইবার অপরাধীরা ক্ষতিকর লিংক, সংক্রমিত ফাইল কিংবা প্রতারণামূলক অ্যাপের মাধ্যমে স্পাইওয়্যার ছড়িয়ে থাকে। তবে বিজ্ঞাপনকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীর কোনো সরাসরি পদক্ষেপ ছাড়াই যন্ত্রে প্রবেশের এই পদ্ধতি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কীভাবে কাজ করে ‘জিরো-ক্লিক’ হামলা?
প্রচলিত সাইবার হামলার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে অনেক সময় কোনো ক্ষতিকর লিংকে ক্লিক করতে হয় কিংবা সংক্রমিত ফাইল খুলতে হয়। কিন্তু ‘জিরো-ক্লিক’ হামলায় ব্যবহারকারীর এমন কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন হয় না। যন্ত্রের অপারেটিং সিস্টেম, ব্রাউজার বা সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারের কোনো দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণকারী স্পাইওয়্যার প্রবেশ করানোর সুযোগ পেতে পারে।

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমন হামলা চালানো হলে ব্যবহারকারী স্বাভাবিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়েই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেও হামলার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ফলে শুধু সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকলেই সব ধরনের সাইবার হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়।

এ ধরনের হামলা শনাক্ত করাও কঠিন হতে পারে। কারণ, ব্যবহারকারী কোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রম না করলেও তাঁর যন্ত্রে ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশের চেষ্টা হতে পারে।

সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কেও বিজ্ঞাপন পৌঁছেছে
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কনফিয়েন্টের গবেষকেরাও ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছেন। তাঁদের তথ্যমতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের কাছে এসব বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়েছে।

এ ছাড়া জাতিসংঘ, ন্যাটো, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের কাছেও বিজ্ঞাপনগুলো পৌঁছেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে বিজ্ঞাপন পৌঁছানো এবং সেই প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রে সফলভাবে স্পাইওয়্যার প্রবেশ—দুটি বিষয় এক নয়। তাই এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের যন্ত্র আক্রান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।

অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক হামলার প্রমাণ
সিটিজেন ল্যাবের গবেষক বিল মারচাক জানিয়েছেন, অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর যন্ত্রে সাইবার হামলা চালানোর বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তবে তাঁদের অনুসন্ধানে এবার এ ধরনের কার্যক্রমের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

গবেষণাটি অনলাইন বিজ্ঞাপনব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সাধারণত পণ্য বা সেবা প্রচারের কাজে ব্যবহৃত হলেও একই ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করে নজরদারি বা সাইবার হামলা চালানো হলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

স্পাইওয়্যার থেকে সুরক্ষিত থাকতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, স্মার্টফোনের অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ নিয়মিত হালনাগাদ রাখা, অবিশ্বস্ত উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল না করা এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের অনুমতি বন্ধ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিরাপত্তা সতর্কতা উপেক্ষা না করা এবং সন্দেহজনক ওয়েবসাইট এড়িয়ে চলাও ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

তবে জিরো-ক্লিক হামলার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর কোনো পদক্ষেপ ছাড়াই আক্রমণ হতে পারে বলে শুধু সতর্কভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়। যন্ত্রের সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা দ্রুত সমাধান করা এ ধরনের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এসএ


সম্পর্কিত খবর