যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নির্ভুলভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা অর্জনে শারীরিক দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন পেশাগত পারদর্শিতা, মানসিক দৃঢ়তা ও সমন্বিত প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বার্ষিক অ্যাসল্ট কোর্স প্রতিযোগিতা এসব সক্ষমতা যাচাই ও বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রামু সেনানিবাসে সম্পন্ন হয়েছে চলতি বছরের প্রতিযোগিতা। এতে ১৭টি দলের অংশগ্রহণে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ৬৬ পদাতিক ডিভিশন দল। রানারআপ হয়েছে প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড দল।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ১০ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত প্রতিযোগিতার সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান। তিনি বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। নিজের বক্তব্যে তিনি কার্যকর প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।
- ১৭ দলের লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন ৬৬ পদাতিক ডিভিশন, রানারআপ প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড
- কার্যকর প্রশিক্ষণের ওপর জোর সিজিএসের
এ যেন যুদ্ধপ্রস্তুতি যাচাইয়েরও ক্ষেত্র
সেনাবাহিনীর অ্যাসল্ট কোর্স প্রতিযোগিতার গুরুত্ব কেবল বিজয়ী নির্ধারণ কিংবা ব্যক্তিগত কৃতিত্ব অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ধরনের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেনাসদস্যদের শারীরিক সক্ষমতা, সহনশীলতা, দ্রুততা, মনোযোগ, শৃঙ্খলা এবং চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালনের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত সক্ষমতা যাচাই এবং দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করারও সুযোগ থাকে।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও কৌশলগত সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়লেও একজন সৈনিকের শারীরিক প্রস্তুতি, মানসিক দৃঢ়তা এবং তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবিলার সামর্থ্য এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণলব্ধ দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগ বড় ভূমিকা রাখে। এ বিবেচনায় অ্যাসল্ট কোর্স প্রতিযোগিতা সেনাসদস্যদের পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির পাশাপাশি সামগ্রিক যুদ্ধপ্রস্তুতির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম।

১৭ দলের লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন ৬৬ পদাতিক ডিভিশন
গত ১৪ অক্টোবর শুরু হওয়া এবারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অঞ্চলের মোট ১৭টি দল অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক পারদর্শিতা প্রদর্শন করে শীর্ষস্থান অর্জন করে ৬৬ পদাতিক ডিভিশন দল। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড দল।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও বিশেষ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন অংশগ্রহণকারীরা। ১১ পদাতিক ডিভিশন দলের ল্যান্স কর্পোরাল (ডিএমটি) হাবিবুর রহমান শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, ১০ পদাতিক ডিভিশন দলের সৈনিক মো. জাহিদুল ইসলাম অর্জন করেছেন দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। দলগত ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই অর্জন প্রতিযোগিতার বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে।
কার্যকর প্রশিক্ষণই অগ্রাধিকার
সমাপনী অনুষ্ঠানে সিজিএস লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমানের কার্যকর প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ সেনাবাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের কেন্দ্রীয় ভূমিকার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশিক্ষণের প্রকৃত সার্থকতা শুধু নির্ধারিত অনুশীলন সম্পন্ন করার মধ্যে নয়; বরং অর্জিত দক্ষতা বাস্তব দায়িত্ব পালনে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তার মধ্যেই নিহিত। সেনাসদস্যদের জন্য নিয়মিত অনুশীলন, দক্ষতার ধারাবাহিক মূল্যায়ন, শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং দলগত সমন্বয় উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এ ধরনের প্রতিযোগিতা সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারস্পরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা অর্জনের ক্ষেত্রও তৈরি হয়।
সৌহার্দ্য, শৃঙ্খলা ও দলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ
প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন পদাতিক ডিভিশন ও বিশেষায়িত ইউনিটের অংশগ্রহণ সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে পেশাগত যোগাযোগ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য জোরদারের সুযোগ সৃষ্টি করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের পাশাপাশি অন্য দলের সক্ষমতা থেকে শেখার সুযোগও তৈরি হয়। সামরিক প্রতিষ্ঠানে দলগত সমন্বয় ও পারস্পরিক আস্থা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সহকর্মীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এবং সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় অ্যাসল্ট কোর্স প্রতিযোগিতার মতো আয়োজন প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও সৌহার্দ্যকে একই ধারায় এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
ধারাবাহিক প্রশিক্ষণেই টেকসই সক্ষমতা
রামু সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এবারের প্রতিযোগিতার সমাপ্তি শুধু একটি বার্ষিক আয়োজনের পরিসমাপ্তি নয়; বরং প্রশিক্ষণলব্ধ দক্ষতা ধরে রাখা ও আরও উন্নত করার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি উপলক্ষ। ১৭টি দলের অংশগ্রহণ এবং দলগত ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্জিত সাফল্য সেনাসদস্যদের সক্ষমতা বিকাশে প্রতিযোগিতামূলক প্রশিক্ষণের ভূমিকা তুলে ধরে। ধারাবাহিক অনুশীলন, দক্ষতার মূল্যায়ন এবং প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের প্রতিযোগিতা সেনাসদস্যদের পেশাগত উৎকর্ষ ও সামগ্রিক প্রস্তুতি বৃদ্ধিতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে ১০ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল গোলাম মাহিউদ্দিন আহমেদসহ সেনাসদর ও কক্সবাজার এরিয়ার ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড় এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সেনাসদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সন্ধানী বার্তা /এমএএএমকে