খেলা

চীনের উত্থানের নেপথ্যে বাংলাদেশি কোচ ফাতেমার দুই বছরের গল্প

‘এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচটা হলে হয়তো বুঝতে পারতেন, কতটা উন্নতি করেছে চীন। মিংইউ ঝু কিছুটা হলেও চমকে দিতে পারত’—চীনের নারী ক্রিকেট দল নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশি কোচ ফাতেমা তুজ জোহরা।

চীনের নারী ক্রিকেটের সাম্প্রতিক উত্থানের গল্পের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই বাংলাদেশি কোচের নাম। প্রায় দুই বছর দলটির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে পিছিয়ে থাকা একটি দল ধীরে ধীরে নিজেদের গড়ে তুলছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ফাতেমার বিশ্বাস, এশিয়ার নারী ক্রিকেটে চীন এখন আর শুধু অংশগ্রহণকারী দল নয়; নিজেদের জায়গা তৈরির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে কাতার জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফাতেমা। অস্ট্রেলিয়া ও মালদ্বীপের পর চীন হয়ে এখন কাতারে তাঁর কোচিং ক্যারিয়ার। তবে চীনের নারী ক্রিকেট নিয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাসটা আলাদা। তাঁর মতে, খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না—নারী ক্রিকেটে চীন বড় চমক দেখাতে পারে।

কালবেলার সঙ্গে আলাপে ফাতেমা বলেন, চীনের ক্রিকেটাররা অত্যন্ত পরিশ্রমী। খাদ্যাভ্যাস, শৃঙ্খলা ও অনুশীলনের ব্যাপারেও তাঁরা যথেষ্ট সচেতন। দ্রুত শেখার সক্ষমতাও তাঁদের বড় শক্তি।

তিনি বলেন, মাত্র দুই বছরেই আইসিসির টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়ে চীন ১০ ধাপ এগিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে নারী ক্রিকেটে দেশটি বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা হংকং চায়না, ইন্দোনেশিয়া ও ওমানের মতো দলকে হারিয়েও নিজেদের উন্নতির প্রমাণ দিয়েছে চীন নারী দল।

ভাষার বাধা পেরিয়ে শুরু

২০২৩ সালের মাঝামাঝি চীন নারী ক্রিকেট দলের সঙ্গে যুক্ত হন ফাতেমা। তখন দলটি নারী ক্রিকেটে খুব একটা এগিয়ে ছিল না। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ক্রিকেটকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল চীন।

ঠিক সেই সময়েই নতুন একটি সমস্যার মুখে পড়তে হয় দলটিকে। একাডেমিক পর্যায়ে স্নাতক শেষ করে ক্রিকেট ছেড়ে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে যোগ দেন দলের ছয় অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। ফলে নতুন খেলোয়াড় খুঁজে বের করা এবং তাঁদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক দল গড়ে তোলার বড় দায়িত্ব এসে পড়ে কোচ ফাতেমার ওপর।

শুধু খেলোয়াড় সংকটই নয়, ফাতেমার সামনে ছিল আরও বড় বাধা—ভাষা।

চীনের একমাত্র বিদেশি কোচ হিসেবে কাজ করতে গিয়ে শুরুতে ভাষাগত সমস্যায় পড়েন তিনি। দোভাষী থাকলেও ক্রিকেট মাঠে কোচিং করানোর ক্ষেত্রে প্রতিটি নির্দেশ অনুবাদ করে বোঝানো সহজ ছিল না। এমনকি ক্রিকেটের মৌলিক শব্দগুলোর সঙ্গেও অনেক খেলোয়াড় পরিচিত ছিলেন না।

ফাতেমা বলেন, বল, রানসহ ক্রিকেটের বিভিন্ন বিষয় খেলোয়াড়েরা নিজেদের ভাষায় বুঝতেন। এর মধ্যেই ছয়জন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার অবসর নেওয়ায় তাঁর চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে যায়।

১৫ দিনের ভাষা কোর্স

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বসে থাকেননি ফাতেমা। শুরুতেই নিজেকে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেন। ইউটিউবের মাধ্যমে ১৫ দিনের একটি ভাষা কোর্স করেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল পুরো ভাষা শেখা নয়, অন্তত ক্রিকেটের প্রয়োজনীয় শব্দগুলো যেন খেলোয়াড়দের সহজভাবে বোঝাতে পারেন।

এরপর শুরু হয় নতুন ক্রিকেটার খোঁজার কাজ।

স্কুল থেকে স্থানীয় লিগ—বিভিন্ন জায়গায় নজর দিতে থাকেন তিনি। স্থানীয় লিগে অংশ নেওয়া স্কুলগুলোর খেলোয়াড়দেরও পর্যবেক্ষণ করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে নতুন ক্রিকেটার বাছাই ও তাঁদের গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ফাতেমার ভাষায়, স্কুল পর্যায় থেকেই খেলোয়াড় খুঁজে বের করে তাঁদের ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন তিনি।

মিংইউ ঝুর উত্থানের গল্প

চীনের বর্তমান অধিনায়ক মিংইউ ঝুর ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটিও ফাতেমার কাছে বিশেষ। কারণ তাঁর মধ্যে ক্রিকেটার হিসেবে সম্ভাবনা দেখেছিলেন এই বাংলাদেশি কোচ।

চীনে নির্দিষ্ট পেশায় যেতে একাডেমিক ডিগ্রিকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মিংইউ ঝুও ক্রিকেটের পাশাপাশি আম্পায়ারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তবে ফাতেমা তাঁর মধ্যে ক্রিকেটার হিসেবে বড় সম্ভাবনা দেখতে পান।

একাডেমিক ডিগ্রি শেষ করার পর তাঁকে পুরোপুরি ক্রিকেটে মনোযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

শুরুতে মিংইউ ছিলেন ব্যাটার। পরে তাঁকে বোলিংও শেখানো শুরু হয়। ধীরে ধীরে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই ক্ষেত্রেই উন্নতি করে দলের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারে পরিণত হন তিনি।

তবে চীনা ক্রিকেটারদের শেখানোর ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পার্থক্যের কথাও উল্লেখ করেন ফাতেমা। বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের অনেক ক্রিকেটার যেখানে ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হন, চীনের মেয়েরা সাধারণত তুলনামূলক বেশি বয়সে ক্রিকেট শুরু করেন। ফলে তাঁদের মৌলিক বিষয়গুলো শেখানো এবং ক্রিকেটের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করানোও বড় চ্যালেঞ্জ।

ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন

মিংইউ ঝু ছাড়াও চীন নারী দলের বর্তমান স্কোয়াডের বেশির ভাগ ক্রিকেটারের উত্থানের গল্পের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে ফাতেমার নাম। ফলে দলটির বর্তমান উন্নতি খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।

সেই অভিজ্ঞতা থেকেই চীনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রত্যাশা তাঁর।

ফাতেমার মতে, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, দ্রুত শেখার সক্ষমতা এবং ক্রিকেট অবকাঠামো নিয়ে কাজ করার সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে চীন নারী ক্রিকেটে দ্রুতই বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে ২০৩২ অলিম্পিককে সামনে রেখে চীনের নারী ক্রিকেট নিয়ে যে বড় পরিকল্পনা রয়েছে, সেটিও আশাবাদী করে তুলেছে তাঁকে।

একসময় এশিয়ার নারী ক্রিকেটে চীনের নাম খুব একটা আলোচনায় না থাকলেও এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। আর সেই পরিবর্তনের গল্পে একজন বাংলাদেশি কোচের দুই বছরের শ্রম ও অভিজ্ঞতাও হয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর