নাগোয়ার আকাশে তখন সন্ধ্যা নামছে। দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে জাপানে পৌঁছে বিশ্রামের আশায় ক্রুজ শিপে উঠেছিল বাংলাদেশ আরচারি দল। কিন্তু স্বস্তির বদলে সেখানে অপেক্ষা করছিল নতুন ভোগান্তি। নির্ধারিত আবাসনে কক্ষ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে দলের সদস্যদের। শেষ পর্যন্ত কক্ষ মিললেও ছিল নানা সংকট—প্রয়োজনের তুলনায় রুম কম, বাথরুম নিয়েও ছিল সমস্যা।
দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি আর আবাসন নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে দলের কয়েকজন সদস্য আয়োজকদের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। আর এই ঘটনাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টকে সতর্কতামূলক চিঠি দিয়েছে এশিয়ান গেমসের সাংগঠনিক কমিটি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের আচরণ আবার ঘটলে ক্রুজ শিপ থেকে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, সাংগঠনিক কমিটি বাংলাদেশের শেফ দ্য মিশনকে একটি চিঠি দিয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তিনি বলতে পারবেন। গেমস-সংক্রান্ত সব বিষয়ই শেফ দ্য মিশনের আওতাধীন বলে জানান তিনি।
প্রমাণ চেয়েছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের শেফ দ্য মিশন মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদের বক্তব্যে অবশ্য কিছুটা অস্বস্তির চিত্র পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, সাংগঠনিক কমিটির পাঠানো চিঠিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণও দেওয়া হয়নি।
এ কারণে পাল্টা চিঠি দিয়ে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এবং যাঁরা ঘটনায় জড়িত ছিলেন তাঁদের পরিচয় চেয়েছেন তিনি। প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়—এমন যুক্তিও তুলে ধরেছেন শেফ দ্য মিশন।
তবে এরই মধ্যে আয়োজকদের কাছে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্ট। যদিও আবাসন নিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভ পুরোপুরি কাটেনি।
ভোগান্তির কেন্দ্রে আরচারি দল
পুরো ঘটনার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ আরচারি দলের নাম। বিশেষ করে দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিককে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা।
প্রবীণ এই কোচ সাধারণত একক কক্ষে থাকার অভ্যস্ত। কিন্তু ক্রুজ শিপে সেই সুবিধা না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন।
তবে বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তানভীর রায়হান বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, গেমসের সাংগঠনিক কমিটি কিংবা এশিয়ান আরচারি—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ফলে দল স্বাভাবিকভাবেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তাঁর প্রশ্ন, দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে রুমের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা এবং কক্ষ না পেয়ে সামান্য উচ্চবাচ্য করা কি এতটাই বড় অপরাধ যে একটি দলকে ক্রুজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে হবে?
চারটি রুম নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা
এদিকে পুরো ঘটনার পেছনে আবাসন বরাদ্দ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সমস্যার কথাও জানা গেছে।
বাংলাদেশের জন্য ক্রুজ শিপে বরাদ্দ করা চারটি কক্ষ অন্য একটি দলকে কোনো পক্ষকে না জানিয়েই নিয়ে নেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ দলের সদস্যরা সেখানে পৌঁছানোর পর তাৎক্ষণিকভাবে তাদের জন্য বিকল্প কক্ষ বরাদ্দ করা সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বাংলাদেশ দলকে। দীর্ঘ ভ্রমণের পর এমন পরিস্থিতিতে দলের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। অপেক্ষার সময় সেই ক্ষোভ প্রকাশের মাত্রা কতটা ছিল, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ঘটনার বিষয়ে প্রকৃত তথ্য ও প্রমাণ সামনে এলে পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে আবাসন নিয়ে তৈরি হওয়া এই জটিলতা এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের শুরুতেই নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে।
আয়োজকদের সতর্কবার্তার পর এখন বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টকে আরও সতর্কতার সঙ্গে চলতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে আবাসন ব্যবস্থাপনা ও দলগুলোর সঙ্গে আয়োজকদের সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সন্ধানী বার্তা/এসএ