মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসে, কিন্তু স্বস্তি থাকে না বেশিদিন। বাড়িভাড়া, বাজার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল আর পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যায় আয়ের বড় অংশ। আগে মাস শেষে কিছু টাকা জমত, এখন সেই সঞ্চয় ভেঙেই চলছে সংসার। কারও কারও ক্ষেত্রে সঞ্চয়ও শেষ, প্রয়োজন মেটাতে নিতে হচ্ছে ঋণ। মধ্যবিত্তের এই আর্থিক টানাপোড়েনের বিপরীতে নিম্ন আয়ের মানুষের সংকট আরও নির্মম। সেখানে সংসারের খরচ কমানোর অর্থ শুধু বিলাসিতা বাদ দেওয়া নয়, খাবার কমিয়ে দেওয়া। মাছ-মাংসের বদলে চাল, ডাল আর আলুতে চলছে অনেক পরিবার। সন্তানের পছন্দের খাবার কেনা দূরের কথা, কোথাও দুধ কেনার সামর্থ্যও থাকছে না।
- বেতন বাড়লেও সংসারে ফিরছে না স্বস্তি
- বাড়িভাড়া, বাজার ও যাতায়াতের খরচে ফুরিয়ে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের আয়, ভাঙছে সঞ্চয়
- অন্যদিকে মাছ-মাংস বাদ দিয়ে চাল-ডালে দিন কাটছে নিম্ন আয়ের পরিবারের
- কোথাও সন্তানের দুধ কেনার সামর্থ্যও নেই
- মূল্যস্ফীতির গতি বেশি হওয়ায় সংকুচিত জীবনযাত্রা
দ্রব্যমূল্যের চাপে দুই শ্রেণির মানুষের জীবনেই নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। মধ্যবিত্ত হারাচ্ছেন সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা, নিম্নবিত্তের মানুষের সংকট গিয়ে ঠেকছে প্রতিদিনের খাবারের থালায়। বেতন বাড়লেও বাড়ছে না স্বস্তি। কারণ মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, গত আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে হয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
বেতন বাড়ে, বাড়ে না স্বস্তি
রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ইসহাক বিন শরীফ। থাকেন শেওড়াপাড়ায়। তার মাসিক বেতন ৪২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৬ হাজার টাকা। চার হাজার টাকা বেতন বাড়লেও সংসারের খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না তিনি। আগে বাসাভাড়া ছিল সাত হাজার টাকা। এখন দিতে হচ্ছে সাড়ে আট হাজার। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধির দেড় হাজার টাকা চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়াতেই। এর বাইরে বেড়েছে যাতায়াত ব্যয়ও। অফিসে সময়মতো পৌঁছাতে বাসের ভিড় কিংবা বাস না পাওয়ার কারণে অনেক সময় মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে হয় তাকে।
ফলে বেতন বাড়ার পরও হাতে বাড়তি টাকা থাকছে না। বরং সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাব কষতে হচ্ছে। ইসহাকের অভিজ্ঞতা রাজধানীর অসংখ্য মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও বাজারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয়ের সুযোগ কমছে। আগে যে টাকা ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখা যেত, এখন তা খরচ হচ্ছে মাসের প্রয়োজন মেটাতে।
সংসারের হিসাব মেলাতে ঋণগ্রস্ত
মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নাদিম হোসেনের পরিবারেও দ্রব্যমূল্যের চাপ বড় সংকট তৈরি করেছে। প্রায় এক বছর ধরে ঋণের বোঝা টানছেন তিনি। নাদিমের ভাষায়, পণ্যের দাম আর বেতনের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সমন্বয় করতে পারছেন না। একটি জিনিস কিনতে গেলে অন্যটি কেনার সামর্থ্য থাকছে না। নাদিমের মতো অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার এখন সঞ্চয়ের পরিবর্তে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। মাসের আয় দিয়ে প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না। ফলে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। একসময় যে সঞ্চয় ছিল বিপদের দিনের নিরাপত্তা, এখন সেই সঞ্চয়ই প্রতিদিনের ব্যয় মেটানোর অবলম্বন।
নিম্নবিত্তের পাতে কমছে খাবার
মধ্যবিত্তের সংকট যেখানে সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর, নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে তা সরাসরি খাবারের ওপর আঘাত হানছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের দাম শুনে অনেকেই ফিরে আসছেন। পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে পুষ্টিকর খাবার। কোনো পরিবারে মাছ-মাংসের পরিমাণ কমেছে, কোথাও চাল, ডাল ও আলুই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা।
এক মধ্যবিত্ত দম্পতির অভিজ্ঞতা, বাজারে ঢুকলেই অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। কয়েক ধরনের সবজি কিনতেই চলে যায় প্রায় পাঁচশ টাকা। মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করা পরিবারের বাজার খরচেই ব্যয় হচ্ছে অর্ধেকের বেশি। এরপর বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এই ব্যয় সামলানো আরও কঠিন। সংসারের খরচ কমাতে কেউ খাবারের পরিমাণ কমাচ্ছেন, কেউ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা বাদ দিচ্ছেন। ফলে খাবারের বৈচিত্র্য ও পুষ্টির সুযোগ দুটোই সংকুচিত হচ্ছে।
সন্তানের দুধ জোগাড় করাও কঠিন
দ্রব্যমূল্যের চাপে নিম্ন আয়ের পরিবারের অসহায়ত্বের সবচেয়ে বেদনাদায়ক চিত্র উঠে এসেছে এক মধ্যবয়স্ক বাবার অভিজ্ঞতায়। পাঁচ বছর আগেও সীমিত আয়ে সংসার চালানো তুলনামূলক সহজ ছিল। এখন রান্নার জ্বালানি জোগাড় করতেও বাড়তি খরচ হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় কখনো কাঠের চুলা, কখনো কেরোসিন ব্যবহার করতে হয়। তিনি বলেন, আগে সীমিত আয়েও সংসার চালাতে পারতেন। এখন বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানের খাবারের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তিনি। দুধ কেনার টাকা নেই। তাই সাবু জ্বাল দিয়ে খাওয়াতে হয় শিশুকে। কিন্তু শিশুটি তা খেতে চায় না। সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারার কষ্টই এখন তার প্রতিদিনের বাস্তবতা।
৩৮২ পণ্যের মধ্যে ২০৩টির দাম বেড়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতি পরিমাপের ঝুড়িতে থাকা ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে সেপ্টেম্বরে ২০৩টির দাম বেড়েছে। কমেছে মাত্র ২৫টির। অপরিবর্তিত ছিল ১৫৪টির দাম। বিশেষ করে প্রোটিনের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রোটিনজাতীয় পণ্যের অবদানও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় দেড় বছর ধরে মজুরি ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হারের ব্যবধান কমছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরে আবার ব্যবধান বেড়েছে। জ্বালানি উপকরণ ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। একই সময়ে সব বিভাগেই মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। তুলনামূলকভাবে ঢাকা বিভাগে মজুরি বৃদ্ধির হার বেশি ছিল।
মূল্যস্ফীতি কমানো ও আয় বাড়ানোর তাগিদ
দ্রব্যমূল্যের চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ কমিয়েছে। উৎপাদন খাতে কম সুদে ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য বিনিয়োগে কাজে লাগাতে সমন্বিত তহবিল গঠন করা হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর উদ্যোগও চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, আগামী বোরো মৌসুমে কৃষি উৎপাদন বাড়লে নিত্যপণ্যের দাম কমতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন খাতে ঋণের জোগান বাড়লে মজুরি বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সতর্ক থাকতে হবে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর পাশাপাশি মানুষের আয় বাড়ানোর উদ্যোগও জরুরি। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দ্রব্যমূল্যের বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার সামর্থ্য সচ্ছল মানুষের থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষের সেই সুযোগ নেই। ফলে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে।
দুই শ্রেণির সংকট, এক বাস্তবতা
মধ্যবিত্তের কাছে এখন সঞ্চয় মানে সংসারের কোনো জরুরি প্রয়োজন মেটানোর শেষ অবলম্বন। সেই সঞ্চয়ও নিয়মিত খরচ মেটাতে ব্যয় হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সংসার চালানোর অর্থ প্রতিদিন খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টির সঙ্গে আপস করা। একদিকে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হারাচ্ছেন মধ্যবিত্ত, অন্যদিকে বর্তমানের মৌলিক চাহিদা পূরণেই হিমশিম খাচ্ছেন নিম্নবিত্ত। দুজনের সংকটের ধরন আলাদা হলেও মূল কারণ একই—আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়া। অর্থনীতির পরিসংখ্যানে এই ব্যবধানের নাম মজুরি ও মূল্যস্ফীতির অসমতা। কিন্তু বাস্তব জীবনে এর পরিণতি আরও স্পষ্ট—মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, নিম্ন আয়ের মানুষের খাবারের থালা ছোট হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তি এখন ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সন্ধানী বার্তা/জেএন/এমএসআইপি