জাতীয়

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগে প্রশ্ন ফাঁসের দায় কার, গাফিলতি কোথায়?

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের তদারকির মধ্যেই যদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় নেবে কে? যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে এখন এ প্রশ্নই সামনে এসেছে। ২৪২টি পদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর অংশ নেওয়ার কথা ছিল পরীক্ষায়। কিন্তু পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এবং ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করার প্রস্তাব পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সব মিলিয়ে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য দুর্নীতির বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।

  • ২৫ লাখ টাকায় চাকরির প্রস্তাব
  • ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
  • নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি

পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে অনিয়মের ঝুঁকি এড়ানোর পদক্ষেপ হলেও প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল এবং চাকরির নামে অর্থ চাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে কোনো চক্র জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে চাকরিপ্রার্থীদের প্রত্যাশা, তদন্ত যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।

প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তায় গাফিলতি ছিল কি?
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, গত শনিবার রাজধানীর ৯৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। পরে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে। আগামী ১৬ অক্টোবর নতুন তারিখে পরীক্ষা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

একটি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। ফলে প্রশ্নপত্র বাইরে যাওয়ার অভিযোগের পর এসব ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি। নিরাপত্তাব্যবস্থায় অবহেলা, নিয়ম ভঙ্গ কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দায়ী করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

২৫ লাখ টাকায় চাকরির প্রস্তাব
পরীক্ষার আগেই চাকরি নিশ্চিত করার প্রস্তাব পাওয়ার দাবি করেছেন এক চাকরিপ্রার্থী। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি জানান, পঞ্চগড়ে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তার কাছে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করার প্রস্তাব আসে। বলা হয়েছিল, পরীক্ষার আগের রাতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্ন সরবরাহ করা হবে।

ওই প্রার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাকে একটি নির্ধারিত স্থানে নিয়ে রাখার কথা বলা হয়। তিনি রাজি না হওয়ায় পরে জানানো হয়, পরীক্ষার দিন সকালে তার বাসায় প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে একজন হাজির হবেন এবং তাকে কেন্দ্রে নিয়ে যাবেন। অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করার শর্তও দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবে সম্মতি দিলে পরীক্ষার আগে মোট অর্থের অর্ধেক এবং প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হলে বাকি টাকা দিতে হতো বলে দাবি করেন তিনি। তবে তিনি প্রস্তাবে রাজি হননি।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এ ধরনের চক্র ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে তাদের যোগসাজশ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই অর্থের বিনিময়ে চাকরির প্রস্তাবের অভিযোগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

ভোগান্তির দায় নেবে কে?
পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চাকরিপ্রার্থীদের বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। ঠাকুরগাঁও থেকে আসা পরীক্ষার্থী শামীম রেজা জানান, আবেদন ও আনুষঙ্গিক খরচের পাশাপাশি ঢাকায় আসতে তার বাসভাড়া লেগেছে ১ হাজার ২০০ টাকা। বন্ধুর মেসে থেকে প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে পারেননি। বাড়ি ফিরতেও আবার যাতায়াতের খরচ বহন করতে হবে তাকে।

অনেক প্রার্থী টিউশনির আয় কিংবা ধার করা অর্থ দিয়ে আবেদন ও যাতায়াতের ব্যয় মেটান। ফলে নিয়োগ পরীক্ষার এমন অনিশ্চয়তা তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এ কারণে পরীক্ষার্থীদের ক্ষতি বিবেচনায় উপযুক্ত প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি উঠেছে।

ছাত্রদল-এনসিপির দাবি, ডাকসুর ভিপির চার দফা
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া গেলে পরীক্ষা স্থগিত করা আগের অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে শ্রেয়তর পদক্ষেপ। তবে দায়ীদের কঠোরতম শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে তারা।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা আয়োজন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ বা উপযুক্ত প্রতিকারের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অপসারণসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন। তার দাবির মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যয় বিবেচনায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া।

তদন্তে বেরিয়ে আসুক প্রকৃত দায়
প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, নিরাপত্তাব্যবস্থায় অবহেলা ছিল কি না এবং চাকরি নিশ্চিতের নামে অর্থ চাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়ার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমাও যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করা উচিত। ভবিষ্যতে নিয়োগ পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে। তাই এখন শুধু নতুন তারিখে পরীক্ষা আয়োজন নয়, বরং প্রশ্ন ফাঁসের উৎস শনাক্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ এবং চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।

সন্ধানী বার্তা /জেএন/এমকে


সম্পর্কিত খবর