শিক্ষা

পিথাগোরাসের সূত্র কি প্রাচীন ব্যাবিলনের আবিষ্কার?

সমকোণী ত্রিভুজের তিন বাহুর সম্পর্ক নির্ণয়ে বহুল পরিচিত পিথাগোরাসের উপপাদ্য। স্কুলের গণিত বইয়ে এই উপপাদ্য পড়েছেন প্রায় সবাই। কিন্তু যে উপপাদ্যটি গ্রিক গণিতবিদ পিথাগোরাসের নামে পরিচিত, সেটি কি সত্যিই তাঁর আবিষ্কার? প্রাচীন সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও গাণিতিক বিশ্লেষণ বলছে, পিথাগোরাসের জন্মের প্রায় এক হাজার বছর আগেই এই সূত্রের ব্যবহার জানত প্রাচীন ব্যাবিলনের মানুষ।

পিথাগোরাসের উপপাদ্য অনুযায়ী, কোনো সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ অন্য দুই বাহুর বর্গের যোগফলের সমান। অর্থাৎ, ত্রিভুজের তিন বাহুর দৈর্ঘ্য (a), (b) ও (c) হলে এবং (c) অতিভুজ হলে সূত্রটি হবে—(a^2+b^2=c^2)।

এই সূত্র ব্যবহার করে সমকোণী ত্রিভুজের অজানা বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা যায়। জ্যামিতি, স্থাপত্য, প্রকৌশলসহ গণিতের নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার রয়েছে। তবে সূত্রটির নামের সঙ্গে যাঁর পরিচয় জড়িয়ে আছে, তিনি যে প্রথম এটি আবিষ্কার করেছিলেন, এমন প্রমাণ নেই।

পিথাগোরাসের আগেই সূত্রের ব্যবহার

প্রাচীন ব্যাবিলনের মাটির ফলকে পাওয়া গাণিতিক তথ্য থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দেই সেখানে পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত গাণিতিক জ্ঞান ব্যবহার করা হতো। এর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হলো ‘আইএম ৬৭১১৮’ নামের মাটির ফলক। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৭৭০ অব্দে তৈরি এই ফলকে একটি চতুর্ভুজের কর্ণের দৈর্ঘ্য নির্ণয়ের হিসাব রয়েছে।

অন্যদিকে, পিথাগোরাসের জন্মকাল ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫৭০ অব্দ। অর্থাৎ ফলকটি তাঁর জন্মের প্রায় ১ হাজার ২০০ বছর আগের।

প্রাচীন ব্যাবিলনের আরেকটি গাণিতিক ফলকেও বর্গক্ষেত্র ও ত্রিভুজসংক্রান্ত হিসাব পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন থেকে গবেষকেরা মনে করেন, ব্যাবিলনীয়রা শুধু সাধারণ গণনাই করত না; জ্যামিতিক সম্পর্ক এবং জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানেও দক্ষ ছিল।

বর্গক্ষেত্রের কর্ণেই লুকিয়ে আছে সূত্র

বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য একটি বর্গক্ষেত্রের কথা ভাবা যাক। বর্গক্ষেত্রের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য যদি (a) হয় এবং কর্ণের দৈর্ঘ্য (d) হয়, তাহলে পিথাগোরাসের উপপাদ্য অনুযায়ী—

(d^2=a^2+a^2=2a^2)

অর্থাৎ, (d=a\sqrt{2})।

প্রাচীন ব্যাবিলনের গণিতবিদেরা বর্গক্ষেত্রের বাহু ও কর্ণের এই সম্পর্ক জানতেন বলে মাটির ফলকে পাওয়া হিসাব থেকে ধারণা করা হয়। মার্কিন গণিতবিদ ব্রুস র‍্যাটনার তাঁর গবেষণাপত্রে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

স্প্রিঙ্গার জার্নালে প্রকাশিত র‍্যাটনারের গবেষণাপত্রের শিরোনাম ‘Pythagoras: Everyone Knows His Famous Theorem, but Not Who Discovered It 1000 Years Before Him’। এতে তিনি ব্যাবিলনীয় গণিতের বিভিন্ন নিদর্শন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পিথাগোরাসের নামে পরিচিত উপপাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ তাঁর জন্মের বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল।

শুধু ব্যাবিলন নয়, প্রাচীন মিসরেও ছিল প্রয়োগ

পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘পিথাগোরিয়ান ট্রিপল’ বা পিথাগোরাসের ত্রয়ী। এমন তিনটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যাকে এই নামে ডাকা হয়, যাদের জন্য (a^2+b^2=c^2) সম্পর্কটি সত্য।

এর পরিচিত উদাহরণ হলো ৩, ৪ ও ৫। কারণ, (3^2+4^2=9+16=25=5^2)। এই তিনটি দৈর্ঘ্য দিয়ে একটি সমকোণী ত্রিভুজ তৈরি করা সম্ভব।

প্রাচীন মিসরের গাণিতিক নথিতেও এ ধরনের সংখ্যার ব্যবহার পাওয়া যায়। মধ্য মিসরীয় সাম্রাজ্যের সময়কার একটি প্যাপিরাসে এমন একটি সমস্যার উল্লেখ রয়েছে, যার সমাধানে ৬, ৮ ও ১০ সংখ্যার সম্পর্ক দেখা যায়। তবে সেখানে আধুনিক অর্থে সমকোণী ত্রিভুজের উপপাদ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি। বরং এটি থেকে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক ব্যবহার করে সমস্যা সমাধানের ধারণা তখনকার মানুষের জানা ছিল।

প্রাচীন ভারতেও ছিল গাণিতিক সূত্রের উল্লেখ

প্রাচীন ভারতের ‘বৌধায়ন শুল্বসূত্র’ নামের গ্রন্থেও সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর সম্পর্কের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ম পাওয়া যায়। শুল্বসূত্রগুলো মূলত বৈদিক যজ্ঞের বেদি নির্মাণ ও জ্যামিতিক পরিমাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষকদের আলোচনায় বৌধায়ন শুল্বসূত্রের সময়কাল সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুর দিক থেকে মধ্যভাগের মধ্যে ধরা হয়। সেখানে বর্গক্ষেত্র, কর্ণ এবং নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নির্মাণের হিসাব পাওয়া যায়। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতীয় গণিতেও এ ধরনের জ্যামিতিক সম্পর্কের ব্যবহার ছিল।

তবে বিভিন্ন সভ্যতায় এই জ্ঞান কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, কিংবা এক সভ্যতার সঙ্গে অন্য সভ্যতার সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তা আদান-প্রদান হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

তাহলে পিথাগোরাসের নামেই পরিচিত হলো কেন?

পিথাগোরাসের ব্যক্তিগত জীবন ও গাণিতিক অবদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত। তাঁর নিজের লেখা কোনো গ্রন্থ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তিনি দক্ষিণ ইতালির ক্রোটনে একটি দার্শনিক ও গাণিতিক সম্প্রদায় গড়ে তুলেছিলেন বলে প্রাচীন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই সম্প্রদায়ের অনুসারীদের বলা হতো পিথাগোরীয়।

পিথাগোরীয়দের মধ্যে গণিত, দর্শন ও সংখ্যার ধর্মীয়-দার্শনিক তাৎপর্য নিয়ে চর্চা হতো। তাঁদের অর্জিত জ্ঞানের কিছু অংশ পরবর্তী সময়ে পিথাগোরাসের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় বলে মনে করেন ইতিহাসবিদেরা।

তবে পিথাগোরাস নিজে উপপাদ্যটি প্রমাণ করেছিলেন কি না, অথবা তাঁর বিদ্যালয়ের সদস্যরা এর কোনো নতুন প্রমাণ তৈরি করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা উপপাদ্যটির ব্যবহার জানত—এমন প্রমাণ থাকলেও পিথাগোরাসের অবদান ঠিক কী ছিল, সে বিষয়ে ঐতিহাসিক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

আবিষ্কার নয়, জনপ্রিয়তার সঙ্গে জড়িয়ে নাম

গণিতের ইতিহাসে কোনো সূত্রের নাম একজন ব্যক্তির নামে পরিচিত হলেই যে তিনিই প্রথম সেটি আবিষ্কার করেছেন, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে একটি ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে, সংরক্ষিত হয়েছে কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে।

পিথাগোরাসের উপপাদ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন হতে পারে। প্রাচীন ব্যাবিলন, মিসর ও ভারতের গাণিতিক নিদর্শনগুলো দেখায়, সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর সম্পর্ক সম্পর্কে জ্ঞান বিভিন্ন সভ্যতায় বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত হয়েছে।

তাই পিথাগোরাসের উপপাদ্যকে তাঁর একক আবিষ্কার হিসেবে নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করার চেয়ে বলা যুক্তিযুক্ত—তাঁর নামে পরিচিত এই গাণিতিক সূত্রের ইতিহাস তাঁর জন্মেরও বহু আগে শুরু হয়েছিল। হাজার বছরের পুরোনো মাটির ফলকগুলো সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।

সূত্র:উইকিপিডিয়া

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর