জাতীয়

শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান সর্বক্ষেত্রে সমান সুযোগ চান জুবাইদা

নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, নারীর অগ্রগতি কেবল কতজন নারী শীর্ষ পদে পৌঁছেছেন, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং আরও কত নারী সেই অবস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাঁদের নেতৃত্ব সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তার ওপরই প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘ওমেন লিডারশিপ সেমিনারে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর অংশ হিসেবে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) ও ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কম
সেমিনারে নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বিপুলসংখ্যক নারী এখনো অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হতে পারছেন না। বাল্যবিয়ে, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব নারীদের সম্ভাবনা বিকাশের পথে বড় বাধা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের ৯০ হাজার ৪৯টি গ্রামের কোটি কোটি নারী এখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পর্যাপ্তভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।

শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান পর্যন্ত সহায়তা জরুরি
শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জুবাইদা রহমান। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৩ সালের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ছাত্রী ঝরে পড়ে। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের হার মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। তাঁর মতে, বিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে কর্মসংস্থান—প্রতিটি পর্যায়ে নারীদের ধারাবাহিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। নারীদের সাক্ষরতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতায় শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রশ্ন করা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে জুবাইদা রহমান বলেন, স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছিলেন। দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। জুবাইদা রহমান বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, সহমর্মিতা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলার মানসিকতা অর্জন করছে।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্তের শক্তি
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, একজন নারীর আয়, সঞ্চয় এবং নিজের আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তাঁর ব্যক্তিগত সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতাকেও শক্তিশালী করে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু আয়ের বিষয় নয়; বরং নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গড়ে তোলার ক্ষমতা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মজীবনে নারীর সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ
নারীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে জুবাইদা রহমান বলেন, প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। পাশাপাশি নারী ও শিশুর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নারীদের কর্মজীবন নির্বিঘ্ন করতে দেশজুড়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, পারিবারিক দায়িত্ব কোনো নারীর ক্যারিয়ার ও পেশাগত অগ্রগতির পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জন এবং দীর্ঘ বিরতির পর আবার কাজে ফিরে আসার সুযোগও নারীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।

প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নারীদের এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল সেবা ও নতুন প্রযুক্তির কারণে কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে উল্লেখ করে জুবাইদা রহমান বলেন, এসব ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মেয়েদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, নারীদের অর্জন উদ্‌যাপনের পাশাপাশি তাঁদের অগ্রগতির পথে থাকা অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আকাঙ্ক্ষাকে সুযোগে, সুযোগকে নেতৃত্বে এবং নেতৃত্বকে বাংলাদেশের জন্য টেকসই প্রভাবে রূপান্তর করা সম্ভব। অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অ্যামচেম ও মার্কিন দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান জুবাইদা রহমান। আলোচনায় অংশ নেওয়া মডারেটর ও প্যানেল সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্যানেল স্পিকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন। প্যানেলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের অ্যাক্টিং ডেপুটি চিফ অব মিশন তৃশিতা মোওলা, শেভরন বাংলাদেশের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং এবং ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা।

সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর