দেশজুড়ে

জরিমানার পরও টিলা কাটা বন্ধ হয়নি ফটিকছড়িতে

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার পরও বন্ধ হয়নি টিলা কাটা। এবার উপজেলার উত্তর পাইন্দং এলাকায় একটি প্রাকৃতিক টিলা কেটে পাকা স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। খালেদা কালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনেই চলছে এ কর্মকাণ্ড। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর পাইন্দং এলাকায় পাইন্দং আমতল থেকে পূর্ব দিকে প্রায় পাঁচ একর আয়তনের একটি প্রাকৃতিক টিলা রয়েছে। টিলাটি সরকারি রাবার বাগানসংলগ্ন। সম্প্রতি ওই টিলার মাটি কেটে সমতল করার পাশাপাশি সেখানে পাকা ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

জরিমানার পরও ফের টিলা কাটার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগে একই এলাকায় টিলা কাটার ঘটনায় অভিযান চালিয়েছিল উপজেলা প্রশাসন। সে সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু জরিমানার পরও টিলা কাটা বন্ধ হয়নি। বরং নতুন করে মাটি কেটে পাকা স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালী মোহাম্মদ শওকত ও তাঁর ছেলে ইরতিসাম কালাম ইরসালের নাম উঠে এসেছে। তাঁরা পাইন্দং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। টিলা কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ শওকত  বলেন, ‘সবকিছু ম্যানেজ হয়ে গেছে।’ একপর্যায়ে ধমকের সুরে তিনি বলেন, ‘আমি কে, চেনেন? আমার ভাই চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন।’ টিলা কাটার বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁকে অনুমতি দিয়েছেন বলেও দাবি করেন শওকত।

অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না: প্রশাসন
তবে টিলা কাটার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করেছেন ফটিকছড়ি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রহমত উল্লাহ।  তিনি বলেন, এর আগে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে টিলা কাটার দায়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন। এরপর আবারও টিলা কাটার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। টিলা কাটার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করবে।

এদিকে আগের অভিযান ও জরিমানার পরও একই স্থানে আবার টিলা কাটার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, আগের অভিযানের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? জরিমানা দিয়েই কি টিলা কাটার মতো অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে? একই অপরাধ আবারও সংঘটিত হওয়ার পর ঘটনাস্থলে নজরদারি কেন বাড়ানো হয়নি? এ বিষয়ে রাবার বাগানসংলগ্ন কাঞ্চননগর বাগানের (বিএফআইডিসি) ব্যবস্থাপক তপন কর্মকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

টিলা কাটায় কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬খ ধারায় পাহাড় ও টিলা কাটা বা মোচনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ আইন লঙ্ঘনের প্রথম অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে দুই থেকে ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা দুই থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এ ছাড়া অপরাধে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন বাজেয়াপ্ত করারও সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী মুনিরা পারভীন রুবা বলেন, ‘পাহাড়-টিলা কাটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। সাধারণত প্রভাবশালী মহল এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ না করায় নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে। এটি প্রতিনিয়ত পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।’

টিলা কাটা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে টিলা কাটা অব্যাহত থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাঁরা অবিলম্বে ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে টিলা কাটা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি মাটি কাটায় ব্যবহৃত এক্সকাভেটরসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ এবং আগের অভিযানের নথি পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে পুনরায় এ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মুজাহিদুর রহমান বলেন, ‘টিলা কাটার বিষয়টি তিনি খোঁজখবর নেবেন। ঘটনাস্থলে লোক পাঠানো হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টিলা কাটার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

সন্ধানী বার্তা/এএইচ/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর