এক্সক্লুসিভ

হাজার কোটি টাকার ভবন অচল, সচল করতে ফের ৩৭০০ কোটি টাকার প্রকল্প!

রপ্তানি বাড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল প্রযুক্তি কেন্দ্র। উদ্দেশ্য ছিল, এসব কেন্দ্রে পণ্যের মান পরীক্ষা হবে, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা পাবেন উদ্যোক্তারা, আন্তর্জাতিক বাজারের শর্ত পূরণে সক্ষমতা বাড়বে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের। কিন্তু হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত সেই কেন্দ্রগুলোর ভবন এখনো কার্যত অচল। কারণ, ভবন তৈরি হলেও কেনা হয়নি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। সাত বছরের বেশি সময়েও শুরু করা যায়নি কেন্দ্র দুটির কার্যক্রম।

শুধু তাই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে তিন দফায় ব্যয় বেড়েছে ৩২৩ কোটি টাকার বেশি। মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে একাধিকবার। এর মধ্যে ঋণচুক্তির সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় ৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার প্রত্যাহার করেছে বিশ্বব্যাংক। এখন পুরোনো প্রকল্পের আওতায় নির্মিত কেন্দ্র দুটি সচল করতে যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে আরেকটি নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে। যার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

  • সাত বছরেও কেনা হয়নি প্রযুক্তি কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, বেড়েছে ব্যয় ৩২৩ কোটি টাকা
  • বিশ্বব্যাংক ফিরিয়ে নিয়েছে ৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার
  • পুরোনো প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে নতুন প্রকল্পে আবারও অর্থায়নের পরিকল্পনা

অর্থাৎ একটি প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণের পরও তা কাজে লাগানো যায়নি। এবার সেই অবকাঠামো কার্যকর করতে প্রয়োজন হচ্ছে নতুন প্রকল্প ও নতুন অর্থায়ন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কোন পর্যায়ে এমন সমন্বয়হীনতা তৈরি হলো? আর বিপুল সরকারি ও বৈদেশিক অর্থ ব্যয়ের পরও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর কাঙ্ক্ষিত ফল কোথায়?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ (ইসিফোরজে) প্রকল্পে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৯৪১ কোটি টাকা। তিন দফা সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৪ কোটি ১৭ লাখ টাকায়। মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি ৩২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, প্রায় ৩৪ শতাংশ।

ভবন হয়েছে, প্রযুক্তি আসেনি
প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাংলাদেশ হাইটেক সিটিতে সিইইটি এবং কাশিমপুরে ডিটিসিএলএফ নামে দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্যের মান যাচাই এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল কেন্দ্র দুটির মাধ্যমে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা না হওয়ায় কেন্দ্র দুটি এখনো চালু করা যায়নি। ফলে অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ ব্যয় হলেও সেখান থেকে উদ্যোক্তারা কোনো কার্যকর সেবা পাচ্ছেন না। একটি প্রযুক্তি কেন্দ্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু ভবনের ওপর নয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল এবং পরিচালনব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের অবকাঠামো কার্যত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে না। ইসিফোরজে প্রকল্পে ভবন নির্মাণ হলেও এসব অপরিহার্য উপাদান নিশ্চিত না হওয়ায় মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে।

টাকা খরচ ৭৮২ কোটি, কাজ শেষ হয়নি এক-চতুর্থাংশেরও বেশি
প্রকল্পের আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতির হিসাবেও রয়েছে অসম্পূর্ণতার চিত্র। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৭৮২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। বিপরীতে ভৌত অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের নির্ধারিত কাজের এক-চতুর্থাংশের বেশি এখনো বাকি। দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন চললেও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দুটি কেন্দ্র চালু করা সম্ভব হয়নি।

এখানে ব্যয়ের পরিমাণের চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যয়ের বিপরীতে কতটা কার্যকর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কারণ, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য প্রযুক্তিগত সেবা নিশ্চিত করাই ছিল প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই সেবা না মিললে নির্মিত অবকাঠামোর অর্থনৈতিক মূল্যও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।

হারাল বিশ্বব্যাংকের ৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার
প্রকল্পের জন্য বড় ধাক্কা এসেছে বৈদেশিক অর্থায়নে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের মূল ১০ কোটি ডলারের বরাদ্দ থেকে ৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এ অর্থ আর পাওয়া যাচ্ছে না।

অথচ প্রযুক্তি কেন্দ্র দুটি চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার আন্তর্জাতিক দরপত্র আগেই আহ্বান করা হয়েছিল। পরে সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। ফলে যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রক্রিয়া থেমে যায়। সময়মতো ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের অর্থায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ ঘটনা প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা, দরপত্র ব্যবস্থাপনা এবং সময়সীমা অনুসরণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে যন্ত্রপাতি কেনা যখন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত, তখন সেই কাজ কেন নির্ধারিত সময়ে শেষ করা গেল না, তার ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।

যন্ত্রপাতি কেনার টাকা কোথায়?
এ অবস্থায় ইসিফোরজে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে অতিরিক্ত ব্যয় না বাড়ানোর কথা বলা হলেও কেন্দ্র দুটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা এবং অবশিষ্ট কাজ শেষ করার অর্থের উৎস এখনো স্পষ্ট নয়।

পরিকল্পনা কমিশন এ কারণে মেয়াদ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা, অবশিষ্ট কাজের অর্থসংস্থান এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা রয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছে। শুধু অর্থায়ন নয়, কেন্দ্র দুটি চালুর পর কে পরিচালনা করবে, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কীভাবে বহন করা হবে এবং প্রকল্প শেষ হলে দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে যাবে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এসব প্রশ্নের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, যন্ত্রপাতি কিনে কেন্দ্র চালু করাই শেষ কথা নয়। দীর্ঘ মেয়াদে সেবা চালু রাখতে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, পরিচালন ব্যয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ব্যবস্থাপনা।

নতুন প্রকল্পে ৩৭০০ কোটি টাকা!
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইসিফোরজে প্রকল্পের দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র এখনো চালু করা সম্ভব না হলেও একই ধরনের সুবিধা সম্প্রসারণে নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ডিপেনিং এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন’ (ডিইডিটিএফইজি) নামের প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ আনুমানিক ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নতুন করে আরও দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি ইসিফোরজে প্রকল্পের আওতায় তৈরি আগের দুটি কেন্দ্রের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আগের প্রকল্পে যে যন্ত্রপাতি কেনার কথা ছিল, তা কেনার জন্য এখন নতুন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। আগের প্রকল্পে যন্ত্রপাতি কেনার কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি কেন? দরপত্র বাতিলের পর বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না? আর যে অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি কোথায় ছিল? নতুন প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই এখনো চলছে। ফলে এর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন চূড়ান্ত হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনও প্রতিটি কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয়, অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।

অর্থ সমন্বয়েও বাধা
পুরোনো প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে বিভিন্ন খাতের অর্থ সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত সংস্থান ও জমি ইজারা খাতের অর্থ ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিদ্যমান নির্দেশনা অনুসারে জমি অধিগ্রহণ ও কন্টিনজেন্সি খাতের অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তরের সুযোগ নেই। ফলে বাকি কাজ শেষ করতে অর্থের প্রয়োজন হলেও বিধিবিধান মেনে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ একদিকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কমে গেছে, অন্যদিকে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে বিদ্যমান বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক নেই, জবাবদিহি কতটা?
দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির পরিচালক (পিডি) পদও শূন্য রয়েছে। বর্তমানে উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, মেয়াদ সম্প্রসারণ, দরপত্র বাতিল এবং বৈদেশিক অর্থায়নের অংশ প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জবাবদিহির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। এক প্রকল্পের অবকাঠামো চালু করতে আরেক প্রকল্পের অর্থায়নের প্রয়োজন হওয়া পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দেয়। তাই নতুন করে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগে আগের প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ, অর্থায়ন ও ক্রয়প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এবং পরিচালনব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করা জরুরি।

সন্ধানী বার্তা /এমএসএএকে/এমকে


সম্পর্কিত খবর