অর্থনীতি

এলপিজি সংকটের আড়ালে ৬০০ কোটি টাকার কারবার

একটি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে একজন গ্রাহক বাড়তি দিচ্ছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এমন লাখো গ্রাহকের বাড়তি খরচ জমতে জমতে এক মাসেই ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। সেই সংকটের মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ—রান্নার গ্যাস কিনতে গিয়ে, পুরোনো সিলিন্ডার বদলাতে গিয়ে, এমনকি গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেও।

এ যেন সংকটের এক অদ্ভুত অর্থনীতি। বাজারে গ্যাসের ঘাটতি, সিলিন্ডার নিয়ে হাহাকার, নির্ধারিত দামে পণ্য না পাওয়া—কিন্তু ভোক্তার খরচ থেমে নেই। বরং সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, রান্নার জ্বালানি কিনতে পরিবারের ব্যয় তত বাড়ছে। এর মধ্যেই আবার মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ২৯ অক্টোবর এ বিষয়ে গণশুনানি করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

  • চুলা জ্বালাতে হিমশিম পরিবার, সিলিন্ডারপ্রতি ৬৬৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায়
  • ভোক্তার পকেটে বাড়তি খরচ, নিষ্ক্রিয় পড়ে আছে কোটি কোটি সিলিন্ডার
  • মজুতের কারসাজিতে বাজার অস্থির, তার মধ্যেই ফের দাম বাড়ানোর আয়োজন

এলপিজির বাজারে এখন তাই শুধু গ্যাসের সংকট নেই; আছে বাড়তি দামের চাপ, সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনার অচলাবস্থা, আমদানিতে অসমতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন। এক মাসে ৬০০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ এই সংকটের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ দিকটি সামনে এনেছে—ভোক্তার বাড়তি ব্যয় কার কাছে যাচ্ছে, আর সেই অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কীভাবে?

বাজার চলে অন্য হিসাবে
অক্টোবর মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। বাজারে সেই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ একটি সিলিন্ডার কিনতেই গ্রাহককে ৪৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার তুলনায় রাজধানীতে দাম আরও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই ব্যবধানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একটি পরিবারের মাসিক বাজেটে রান্নার গ্যাস অপরিহার্য ব্যয়। দাম নির্ধারণের পরও যদি সেই দামে সিলিন্ডার না মেলে, তাহলে সরকারি মূল্যঘোষণার বাস্তব সুফল কোথায়? আর যে গ্রাহক বাড়তি টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁর সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় কে নেবে? সংকটের মধ্যে কোথাও পুরোনো সিলিন্ডার ফেরত নেওয়া হচ্ছে না। ফলে গ্যাস শেষ হলে খালি সিলিন্ডার বদলে নতুন গ্যাস নেওয়ার পরিবর্তে নতুন সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অর্থাৎ বাড়তি দাম দিয়ে গ্যাস কেনার পাশাপাশি সিলিন্ডারের জন্যও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

৬০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ আদায়
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে এক মাসেই ভোক্তাদের কাছ থেকে ৬০০ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের কথাও বলেছেন।

এই অভিযোগের তাৎপর্য বুঝতে বাজারের বাস্তব চিত্রই যথেষ্ট। নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতিটি সিলিন্ডারে শত শত টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয় বহন করছেন এমন মানুষ, যাঁদের রান্নার গ্যাসের বিকল্প সহজে পাওয়া যায় না। কারও কাছে এটি মাসিক বাজেটের বড় ধাক্কা, কারও কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলানোর নতুন সংকট।

৬০০ কোটি টাকা তাই শুধু একটি বড় অঙ্ক নয়; এটি ভোক্তাদের সম্মিলিত বাড়তি ব্যয়ের প্রতীক। এই অর্থের বিপরীতে কত পরিবার বাড়তি খরচ করেছে, কত সিলিন্ডার বেশি দামে বিক্রি হয়েছে এবং বাজারের কোন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হয়েছে—এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা জরুরি। শামসুল আলমের দাবি, মজুতের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করতে হবে। দায়ীদের শনাক্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে সংকট থাকলেই দাম বাড়বে, আর সেই বাড়তি খরচ নির্বিচারে ভোক্তাকে বহন করতে হবে—এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না।

গ্যাস আছে, সিলিন্ডার নেই
দেশে এলপিজি আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি কোম্পানির। কিন্তু গত আগস্টে আমদানি করেছে ১৩টি এবং সেপ্টেম্বরে মাত্র ১০টি কোম্পানি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনে বাজারে সরবরাহ করছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ প্রায় নামমাত্র।

লোয়াব ও বিইআরসি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডার রয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় ১০টি কোম্পানির সিলিন্ডার প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি সেলিম খানের দাবি, প্রায় আড়াই কোটি সিলিন্ডার অলস পড়ে আছে। তাঁর ভাষ্য, ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি নিয়মিত এলপিজি সরবরাহ করছে না।

এই পরিস্থিতির একটি অদ্ভুত দিক আছে। একদিকে বাজারে সিলিন্ডার আছে, অন্যদিকে গ্রাহককে নতুন সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। কারণ, বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানির সিলিন্ডার অনেক খুচরা বিক্রেতা নিতে চাইছেন না। অথচ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম অনুসারে কোম্পানিগুলোর যেকোনো সিলিন্ডার ফেরত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তিনটি এলপিজি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, একজন গ্রাহকের কাছে একটি সিলিন্ডার নিয়মিত পৌঁছে দিতে সরবরাহব্যবস্থায় চারটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার কার্যক্রমের বাইরে থাকলে আমদানি বাড়িয়েও দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন। নিষ্ক্রিয় সিলিন্ডারগুলো ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারলে সরবরাহের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আমদানি হলেও স্বস্তি নেই
নিয়মিত আমদানিকারকদের তথ্য জানায়, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। একসময় মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টন পর্যন্ত আমদানি করা হলেও এখন সেই পরিমাণে পৌঁছানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, চাহিদা বাড়লেও আমদানি সেই হারে বাড়ছে না।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, আমদানি কমেনি; তাই সরবরাহ সংকট হওয়ার কথা নয়। যেসব কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না, তাদের ঋণপত্র খোলার জটিলতা কমাতে জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দিয়েছে কমিশন। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

কিন্তু বাজারের বাস্তবতা হলো, মোট আমদানির পরিমাণ আর প্রতিটি এলাকার গ্রাহকের কাছে গ্যাস পৌঁছানো এক বিষয় নয়। কোনো কোম্পানি সরবরাহ কমালে, কোনো পরিবেশক গ্যাস না পেলে কিংবা সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনা অকার্যকর হলে আমদানি থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি হতে পারে।

সংকটের মধ্যেই নতুন দাম, বাড়তি কমিশনের দাবি
এলপিজির দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, জাহাজভাড়া, বিমা, ডলারের বিনিময় হার ও জ্বালানি তেলের দাম বিবেচনা করে বিইআরসি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। তাই নতুন করে দাম সমন্বয় প্রয়োজন। পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও কমিশন বাড়ানোর দাবি তুলেছেন।

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির দাবি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত দামে ব্যবসা চালানো কঠিন। তাদের প্রস্তাব, প্রতি সিলিন্ডারে পরিবেশক পর্যায়ের কমিশন ৮০ টাকা বাড়াতে হবে। খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। অন্যদিকে, আমদানিকারক বা অপারেটর কোম্পানিগুলোর বক্তব্য, প্রতি মাসে সৌদি আরবের ঘোষিত এলপিজি মূল্য, প্রিমিয়াম, জাহাজভাড়া, বিমা ও ডলারের দর ধরে দাম সমন্বয় করা হলেও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে।

ব্যাংকের ঋণপত্রে জট, বাজারে সরবরাহের চাপ
আমদানি বন্ধ রাখা কোম্পানিগুলোর দাবি, গত দুই বছর ধরে তারা ঋণপত্র খুলতে সমস্যায় পড়ছে। শতভাগ অর্থ জমা না দিলে ব্যাংক ঋণপত্র দিচ্ছে না বলে তাদের অভিযোগ। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকায় লেনদেনেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, নিয়মিত আমদানিকারকেরা বলছেন, বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে আমদানিতে বাধা নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে বড় অঙ্কের দায় রয়েছে, তাদের আর্থিক জটিলতার কারণেই আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। এই জটিলতা বাজারের সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু ঋণপত্র খোলার সুযোগ বাড়ানো যথেষ্ট নয়।

সংকট কাটার আশ্বাস, কিন্তু কবে?
ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেছেন, আমদানি বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং আগামী মাসে সরবরাহ সংকট থাকবে না বলে তাঁরা আশা করছেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতির উন্নতিও হচ্ছে। কিন্তু গ্রাহকের কাছে সংকট কাটার অর্থ হলো—দোকানে গেলে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া, পুরোনো সিলিন্ডার বদলে নতুন গ্যাস নেওয়া এবং রান্নার জ্বালানি কিনতে বাড়তি অর্থ গুনতে না হওয়া। সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস তখনই অর্থবহ হবে, যখন এই পরিবর্তন বাস্তবে দেখা যাবে।

সন্ধানী বার্তা/এমএসএএকে/এমকে


সম্পর্কিত খবর