প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বির উপস্থিতি সহজে শনাক্ত করতে মোড়কের সামনের অংশে সতর্কবার্তা চালুর দাবিতে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু হয়েছে। ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে সহায়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দুই মাসব্যাপী এ গণমাধ্যম প্রচারণা শুরু করা হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। আয়োজকদের মতে, প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল বা ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) থাকলে ভোক্তারা কোনো খাবারে ক্ষতিকর উপাদান অতিরিক্ত পরিমাণে রয়েছে কি না, তা সহজেই বুঝতে পারবেন। বর্তমানে প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগুণ ও উপাদান সম্পর্কে জানতে ভোক্তাদের সাধারণত মোড়কের গায়ে থাকা তথ্য পড়তে হয়। আয়োজকদের বক্তব্য, প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার সহজে শনাক্ত করা যাবে।
এ ধরনের লেবেলিং ব্যবস্থা চালু হলে খাবার কেনার সময় ভোক্তারা দ্রুত পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য বুঝতে পারবেন এবং তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত খাবার কেনার প্রবণতা কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোগটির আয়োজকেরা।
জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সভাকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রচারণার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর মোড়কজাত খাবার ও পানীয় সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে মোড়কের সামনে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রবিধানমালা প্রণয়নে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। আয়োজকেরা মনে করছেন, জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি সতর্কতামূলক লেবেল চালুর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে ভোক্তারা পণ্যের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন এবং খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
প্রচারণার অংশ হিসেবে ভিডিও ও অডিও বিজ্ঞাপন, স্থিরচিত্র এবং বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক উপকরণ তৈরি ও প্রচার করা হবে। টেলিভিশন, রেডিও, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ও মুদ্রিত সংবাদপত্র এবং গুগল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব উপকরণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারণার বার্তা প্রকাশ করা হবে। সাধারণ মানুষকে প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগুণ এবং অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণের সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার প্রেক্ষাপটে এ প্রচারণা শুরু হয়েছে। আয়োজকদের দেওয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ। হৃদ্রোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস এ ধরনের রোগের অন্যতম প্রধান উদাহরণ।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্যে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের হার প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং স্থূলতার হার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্ট্রোকসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার নিয়মিত গ্রহণের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো তাই জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্যাকেটের সামনে সতর্কবার্তা থাকলে খাবারের উপাদান সম্পর্কে সহজে ধারণা পাওয়া যায় এবং খাদ্য নির্বাচনে সচেতনতা তৈরি হতে পারে।
প্রচারণায় প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশে অষ্টভুজ আকৃতির সতর্কবার্তা চালুর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এ ধরনের লেবেলে কোনো পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে তা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আয়োজকেরা মনে করেন। পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য সহজ ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করলে ভোক্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। বিশেষ করে কেনাকাটার সময় দীর্ঘ উপাদান তালিকা বিশ্লেষণ না করেও সতর্কবার্তার মাধ্যমে পণ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আয়োজকদের মতে, এ ধরনের লেবেলিং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগের ঝুঁকি কমানোর একটি প্রমাণভিত্তিক নীতিগত উদ্যোগ। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
আয়োজকেরা জানান, সাধারণভাবে ব্যবহৃত প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়তে থাকা অস্বাস্থ্যকর উপাদান সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এ প্রচারণার অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে দেশে প্যাকেটজাত খাদ্য ও পানীয়ের মোড়কের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল চালুর বিষয়ে প্রবিধানমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা করাও এ উদ্যোগের লক্ষ্য। এ জন্য ভোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা ও আলোচনা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন আহমেদ, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের এবং সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের (সিএলপিএ) সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম। প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান), ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, কোয়ালিশন ফর হেলদি ফুড এবং সিএলপিএ যৌথভাবে এ প্রচারণার আয়োজন করেছে।
সন্ধানী বার্তা/ডিএইচ/এমএসআইপি