রাজধানীর সড়কে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং নির্ধারিত স্টপেজ না মানার প্রবণতা বন্ধে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর কয়েকটি রুটে চালু হতে যাচ্ছে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতি। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট রুটে একটি কোম্পানির অধীনে সমন্বিতভাবে বাস পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া বাস থামানোর বিরুদ্ধে জরিমানা ও অভিযান জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর গণপরিবহনে দীর্ঘদিন ধরে একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করে আসছে। যাত্রী তুলতে বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, যেখানে-সেখানে থামানো এবং নির্ধারিত স্টপেজ উপেক্ষা করার কারণে সড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তন করে বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের পরিবর্তে একটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনা করা।
প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ছয়টি সাধারণ বাস রুটে এবং তিনটি সার্কুলার রুটে নতুন ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সাধারণ রুটগুলোর মধ্যে পাঁচটিতে নন-এসি এবং একটি রুটে এসি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নতুন ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হলো যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর প্রবণতা কমানো। এতে শুধু বাস কোম্পানির পরিচালনব্যবস্থায় পরিবর্তন নয়, সড়কে চলাচলের নিয়ম মানার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামালে জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের যেখানে-সেখানে হাত দেখিয়ে বাস থামানোর প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যাত্রী তুলতে বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বন্ধ হলে সড়কে যান চলাচল আরও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।প্রথম পর্যায়ে ৩২টি প্রস্তাবিত সাধারণ বাস রুটের মধ্যে ছয়টি রুট নির্বাচন করা হয়েছে। এসব রুটে বিভিন্ন পরিবহনের বাস নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হবে।গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রুটে শিববাড়ী, টঙ্গী, বিমানবন্দর, মহাখালী, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নিউমার্কেট হয়ে বাস চলাচল করবে। এ রুটে ভিআইপি পরিবহন ও বিকাশ পরিবহনের বাস ‘ভিআইপি পরিবহন’ কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হবে। এ রুটে বাসের সংখ্যা ২৫৩টি।
মিরপুর-কেরানীগঞ্জ রুটে চিড়িয়াখানা, মিরপুর-১, কল্যাণপুর, শাহবাগ, জিরো পয়েন্ট ও বাবুবাজার হয়ে বাস চলাচল করবে। এ রুটে দিশারী পরিবহন, তানজিল পরিবহন ও মেট্রো লিংকের বাস ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’ কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হবে। এ রুটে বাস থাকবে ১৩৩টি।ঘাটারচর-ডেমরা রুটে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, মৎস্যভবন, রাজমনি, মৌচাক, রামপুরা ও বনশ্রী হয়ে বাস চলাচল করবে। এ রুটে ‘রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ’ কোম্পানির অধীনে ৭০টি বাস পরিচালিত হবে।ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, শাহবাগ, পল্টন, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান ফ্লাইওভার, মাতুয়াইল ও সাইনবোর্ড হয়ে বাস চলবে। এ রুটে রজনীগন্ধা, মালঞ্চ, সময় ও মিডলাইন পরিবহনের বাস ‘ফোর স্টার বাস লাইন’ কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হবে। এ রুটে বাসের সংখ্যা ১৫০টি।
ঘাটারচর-ধউর রুটে মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১, কালশী, বিমানবন্দর ও আবদুল্লাহপুর হয়ে বাস চলাচল করবে। এ রুটে পরিস্থান ও প্রজাপতি পরিবহনের বাস ‘পিএনপি সিটি সার্ভিস’ কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হবে। এ রুটে থাকবে ১৯০টি বাস। অন্যদিকে টঙ্গী-ঢাকেশ্বরী রুটে কলেজগেট, আবদুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে, ফার্মগেট, আসাদগেট, সায়েন্স ল্যাব ও আজিমপুর হয়ে বাস চলবে। এ রুটে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির অধীনে ২০টি বাস পরিচালিত হবে।সাধারণ বাস রুটের পাশাপাশি রাজধানীর তিনটি সার্কুলার রুটেও নতুন ব্যবস্থার আওতায় বাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব রুটে নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে বাস চলাচল করবে।প্রথম সার্কুলার রুটটি ফার্মগেট থেকে শুরু হয়ে পলাশী, পান্থপথ সিগন্যাল, সেন্ট্রাল রোড, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট ও আজিমপুর হয়ে চলাচল করবে। এ রুটে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস চলবে।
দ্বিতীয় সার্কুলার রুটটি মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হয়ে আসাদগেট, ধানমন্ডি-২৭, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, পলাশী, জিগাতলা ও শংকর হয়ে আবার মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ফিরবে। এ রুটেও ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস পরিচালিত হবে।তৃতীয় সার্কুলার রুটটি কদম চত্বর থেকে শুরু হয়ে জমজম টাওয়ার, হাউস বিল্ডিং, স্লুইস গেট, কামারপাড়া খালপাড়, মেট্রো ডিপো, নর্থ স্টেশন ও সেন্ট্রাল স্টেশন হয়ে পঞ্চবটিতে পৌঁছাবে। এ রুটে ‘উত্তরা’ বাস কোম্পানির ২০টি বাস চলাচল করবে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম মনে করেন, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজধানীর বাস চলাচল ও ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তাঁর মতে, বাস পরিচালনার পাশাপাশি নির্ধারিত স্টপেজ ও সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বলেন, আইন অমান্যকারী বাসচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা প্রয়োজন। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বাস পরিচালনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১১ অক্টোবর থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের সহযোগিতায় রাজধানীর ১৭টি স্থানে অবৈধ ও বিশৃঙ্খলভাবে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধে এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ফুলবাড়িয়া যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. আউয়াল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হাজী আবুল কাশেম জানিয়েছেন, বর্তমানে ১৭টি স্থানে স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করছে। যেখানে-সেখানে বাস থামানো বন্ধ করা এ কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য। নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামালে জরিমানাও করা হচ্ছে।
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগের ওপর। নির্ধারিত রুট ও স্টপেজ মেনে বাস চলাচল নিশ্চিত করা গেলে যাত্রী ওঠানো-নামানো নিয়ে প্রতিযোগিতা কমতে পারে। একই সঙ্গে সড়কে অযথা যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সন্ধানী বার্তা/এসকে/এমএসআইপি