দেশে অগ্নিকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং মানুষের জীবন, আবাসন নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। রাজধানীর বহুতল ভবন থেকে শুরু করে পর্যটনকেন্দ্র—বিভিন্ন স্থানে আগুনের ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদহানির খবর সামনে আসছে নিয়মিত। আগুন লাগার পর উদ্ধার তৎপরতা শুরু হলেও অনেক ক্ষেত্রে ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পাশাপাশি আগুন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে?
- পাঁচ বছরে ক্ষতি ২ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা
- আবাসিক ভবনে বেশি ঝুঁকি; বৈদ্যুতিক গোলযোগ, প্রস্তুতির অভাব
- আইনের দুর্বল প্রয়োগ বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান বলছে, অগ্নিকাণ্ডের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। গত পাঁচ বছরে এসব ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৬৯ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্তই সারা দেশে ১৯ হাজার ৮৪৬টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি। এসব পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের সর্বস্ব হারানো, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর বেদনা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট।
প্রাণহানির ঘটনা সতর্কবার্তা দিচ্ছে
গত ২৭ জুন রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কাঁটাবনে একটি ১৪ তলা আবাসিক ভবনের ১২ তলায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হওয়া দুজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। এর আগে ১৬ জানুয়ারি উত্তরার একটি আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে দুটি পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ গত শনিবার ভোরে কক্সবাজারের ইনানী বিচসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আহত ও দগ্ধ হন আরও অনেকে।
ঘটনাগুলোর স্থান ও পরিস্থিতি আলাদা হলেও এগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে—আগুনের সময় মানুষের নিরাপদে বেরিয়ে আসা এবং দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। আবাসিক ভবনে একাধিক পরিবারের বসবাস, বহুতল ভবনের উচ্চতা কিংবা পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের রাতযাপন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে আগুনের বিস্তার ঠেকানো না গেলে ধোঁয়া ও তাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, আর নিরাপদে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। তাই শুধু অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; সেগুলো ব্যবহার করার দক্ষতা এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতিও থাকতে হবে।
বছরে হাজার হাজার আগুন, ক্ষতির অঙ্ক শতকোটি টাকা
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডে আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ ৭ হাজার টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। ২০২৪ সালে ২৬ হাজার ৬৫৯টি ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪৪৬ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
পরিসংখ্যানের তুলনায় দেখা যায়, প্রতিবছর অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা কাছাকাছি থাকলেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ শুধু কতটি আগুন লাগল, সেই হিসাব দিয়ে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। আগুন কোথায় লাগছে, কত দ্রুত ছড়াচ্ছে, সেখানে কী ধরনের দাহ্যবস্তু রয়েছে এবং আগুন নেভানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে।
অগ্নিকাণ্ডের আর্থিক ক্ষতি শুধু পুড়ে যাওয়া স্থাপনা বা মালামালের বাজারমূল্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়ে গেলে তাদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের চাপ তৈরি হয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ব্যবসা আবার চালু করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সরাসরি হিসাবের চেয়েও বড় হতে পারে।
বৈদ্যুতিক গোলযোগ বড় ঝুঁকি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ বিশ্লেষণে বৈদ্যুতিক গোলযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৯ হাজার ৩৯২টি ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। অর্থাৎ ওই বছরের মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৩৬ শতাংশের সঙ্গে এই কারণটি জড়িত ছিল।
বৈদ্যুতিক সংযোগে ত্রুটি, নিম্নমানের তার ও সরঞ্জাম, অতিরিক্ত লোড এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আগুনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ভবনে নতুন বৈদ্যুতিক যন্ত্র যুক্ত হলেও সংযোগব্যবস্থা সেই বাড়তি চাপ সামলানোর উপযোগী কি না, তা অনেক সময় যাচাই করা হয় না। আবার ত্রুটিপূর্ণ তার বা সংযোগের সমস্যা দেখা দিলেও তাৎক্ষণিক মেরামতের বদলে অবহেলা করা হয়।
এই ঝুঁকি কমাতে ভবনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা, অনুমোদিত ও মানসম্মত সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত মেরামত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আবাসিক ভবন, হোটেল ও রিসোর্টের মতো স্থানে এ ধরনের পরীক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে করা দরকার। কারণ, এসব স্থানে আগুন লাগলে সেখানে অবস্থানরত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগের সময়টাই গুরুত্বপূর্ণ
আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করে—এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার পর দ্রুত ইউনিট পাঠানো হলেও যোগাযোগ ও সড়কব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটায়।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, তাঁদের নিয়মিত কার্যক্রম অনুযায়ী আগুনের সংবাদ পাওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে স্টেশন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ কার্যক্রমের রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হয়।
তবে দ্রুত স্টেশন ত্যাগ করা এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। যানজট, সরু সড়ক, ভবনে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা কিংবা আশপাশে পর্যাপ্ত জায়গার অভাব উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। এ কারণে অগ্নিনিরাপত্তার পরিকল্পনায় ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতির পাশাপাশি ভবনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহর মতে, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি কমাতে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রথম সাড়াদানকারীদেরও প্রশিক্ষিত করতে হবে। অর্থাৎ আগুন লাগার মুহূর্তে ভবনের বাসিন্দা, কর্মচারী বা নিরাপত্তাকর্মীরা যেন পরিস্থিতি বুঝে নিরাপদ পদক্ষেপ নিতে পারেন, সেই প্রস্তুতি থাকতে হবে।
ভবন নির্মাণে নিয়ম থাকলেই হবে না, বাস্তবায়নও জরুরি
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ভবন নির্মাণের সময় প্রযোজ্য বিধিমালা ও নিরাপত্তার শর্ত কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেছেন, ভবন নির্মাণবিধি ও অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে মানার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে ব্যবস্থা থাকার চিত্র পাওয়া গেলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয় না।
এ সমস্যা সমাধানে শুধু ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করলেই চলবে না। ভবন ব্যবহারের সময়ও নিয়মিত পরিদর্শন প্রয়োজন। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কার্যকর আছে কি না, জরুরি বহির্গমনপথ বাধামুক্ত কি না, সতর্কীকরণব্যবস্থা সচল কি না এবং বাসিন্দারা আগুনের সময় করণীয় জানেন কি না—এসব বিষয় নিয়মিত যাচাই করতে হবে।
নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নিরাপত্তাবিধি অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ভবনমালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। অগ্নিনিরাপত্তাকে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষার অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শুষ্ক মৌসুমে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
সাবেক মহাপরিচালক আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়তে পারে। এ সময়ে শুষ্ক আবহাওয়া এবং হিটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে মৌসুমভিত্তিক সতর্কতা, বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।
তবে অগ্নিনিরাপত্তাকে শুধু শীতকাল বা নির্দিষ্ট মৌসুমের প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বছরের সব সময় ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাসিন্দা ও কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে জরুরি মুহূর্তে আতঙ্কের পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।
প্রতিরোধেই কমবে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
দেশে অগ্নিকাণ্ডের পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক প্রাণহানির ঘটনা দেখাচ্ছে, শুধু আগুন নেভানোর সক্ষমতা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন আগুন লাগার ঝুঁকি কমানো, দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা।
এ জন্য ভবনের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা, বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণ এবং বিধিমালার কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং উদ্ধারকাজে প্রতিবন্ধকতা কমানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডে প্রতিবার প্রাণহানি ও বিপুল সম্পদহানির পর নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশের বদলে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, আগুন লাগার পর ক্ষতি পূরণ করা কঠিন; কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি, কার্যকর নজরদারি ও জনসচেতনতার মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আগেই কমানো সম্ভব।
সন্ধানী বার্তা/এমএসএএকে/এমকে