আন্তর্জাতিক

স্থলযুদ্ধ নাকি বিমান হামলা, কঠিন সিদ্ধান্তে সৌদি আরব

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলায় বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে সৌদি আরব। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে নিজেদের ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়ার পর গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে কীভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে ভাবছে রিয়াদ। বিমান হামলা জোরদার করা, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে আরও সহায়তা দেওয়া কিংবা সরাসরি স্থলযুদ্ধে জড়ানো—প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে রয়েছে সামরিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুতিদের হামলা শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের প্রভাবও এতে যুক্ত হয়েছে। ফলে সৌদি আরবের সামনে এখন এমন কৌশল বেছে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যাতে নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ঝুঁকিও এড়ানো যায়।

রিয়াদে হামলার পর বাড়ছে পাল্টা জবাবের চাপ

গত সপ্তাহে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করে সৌদি আরব। তবে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর তৎপরতার পরও হুতিরা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়িয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরবর্তী হামলার ঘটনায় হতাহত ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের খবরও সামনে আসে।

হুতিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিচ্ছে। এতে শুধু দেশটির নিরাপত্তাই নয়, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে সৌদি নেতৃত্বের ওপর কঠোর জবাব দেওয়ার চাপ বাড়ছে।

স্থলযুদ্ধে জড়ানো নিয়ে বড় উদ্বেগ

সৌদি আরব এখন পর্যন্ত মূলত বিমান হামলার মাধ্যমে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা দিয়েছে। দেশটি সরাসরি বড় আকারে স্থলসেনা মোতায়েন করা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু রিয়াদে প্রাণঘাতী হামলার পর এই অবস্থান কত দিন বজায় রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সৌদি রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষক ও লেখক আলী শিহাবি সিএনএনকে বলেছেন, হুতিদের হুমকি দীর্ঘমেয়াদে মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রণক্ষেত্রে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দক্ষতা এবং সৌদি আরবের বিমান হামলার সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে ইয়েমেনে সরাসরি সেনা পাঠালে সৌদি আরবকে দুর্গম ভূখণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের সংঘাতে সামরিক সাফল্য নিশ্চিত করা কঠিন। পাশাপাশি প্রাণহানি, বিপুল ব্যয় এবং নিরাপত্তাহীনতা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরব নিজেদের বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সেই ভাবমূর্তি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে শক্তিশালী হুতিরা

একসময় ছোট ধর্মভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে পরিচিত হুতি গোষ্ঠী গত দুই দশকে শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ইরানের সহায়তায় তাদের অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তাদের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অভিযোগ, ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়িয়েছে। ইয়েমেনের এক সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নতুন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।

প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে অবস্থানরত একটি গোষ্ঠী তাদের ক্লড এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের গাইডেন্স সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে। তবে ওই গোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি এবং তাদের সঙ্গে হুতিদের সরাসরি সম্পর্কও নিশ্চিত করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব

হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সমর্থন চেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো কয়েকটি দেশও সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সরাসরি বিমান হামলায় যোগ দেয়নি। তবে নতুন গঠিত যৌথ কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের জন্য ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আলী শিহাবির মতে, মার্কিন স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে। এ ধরনের সহায়তা সৌদি আরবের সামরিক অভিযানেও কার্যকর হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে যুক্ত হলে যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ সামরিক অংশগ্রহণ ছাড়া সৌদি আরবকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।

জ্বালানি অবকাঠামো ও অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা

সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে তেল উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ছড়িয়ে রয়েছে। এসব স্থাপনা তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে। ফলে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।

জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজার, পণ্য পরিবহন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনাকেও চাপে ফেলতে পারে।

সামরিক শক্তি প্রয়োগ নাকি কূটনৈতিক সমাধান

সৌদি আরবের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে হুতিদের হামলা প্রতিরোধ করা যায়, অথচ নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে না হয়। বিমান হামলা জোরদার করলে হুতিদের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত হানার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এতে পাল্টা হামলার ঝুঁকিও থেকে যায়। অন্যদিকে, স্থলযুদ্ধে প্রবেশ করলে সংঘাতের ব্যয় ও সময় দুটিই বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা—সবকিছুই সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তৃতি বিবেচনায় নিয়ে রিয়াদকে সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি শুধু প্রতিশোধ নেওয়ার নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষারও।

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর