মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরনে বাংলাদেশের তৈরি স্যুট—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সক্ষমতা। গত ৫ অক্টোবর নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে এক রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প যে গাঢ় নীল স্যুটটি পরেছিলেন, সেটি নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) তৈরি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফ জহির। ঘটনাটি শুধু একটি পোশাকের উৎপত্তির খবর নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও সামনে এনেছে।
মার্কিন ব্র্যান্ড ‘জোস. এ. ব্যাংক’-এর ওই স্যুটটি তৈরি করেছে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফ জহিরের মতে, একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরনে বাংলাদেশে তৈরি স্যুট দেখা দেশের দক্ষ শ্রমিক, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং সাশ্রয়ী উৎপাদনব্যবস্থার সক্ষমতার প্রতিফলন। তবে স্যুটটির উৎপত্তি নিয়ে সিএনএন এর আগে বাংলাদেশ অথবা চীনে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল।
- ইউরোপের বাজারে সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত
- যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা
- আট মাসে রপ্তানি কমলেও আগস্টে প্রবৃদ্ধি ১১.১৫ শতাংশ
- বড় চ্যালেঞ্জ সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা
ইউরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রেই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বড় বাজার ইউরোপ। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, সেখানে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন রপ্তানিকারকেরা।
শরিফ জহির বলেন, ইউরোপীয় বাজার প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে আসায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর প্রতিষ্ঠান স্যুট, ব্লেজার, জ্যাকেট ও ট্রাউজারের পাশাপাশি ডেনিম, সোয়েটার, নারী-পুরুষের পোশাক এবং অ্যাক্টিভওয়্যার উৎপাদন করে।
প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পাঁচ লাখ বর্গফুটের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সেখানে স্বয়ংক্রিয় কাপড় কাটার যন্ত্র, বিশেষায়িত সেলাই ও প্রেসিং মেশিন এবং পণ্য পরিবহনে কনভেয়ারভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান বজায় রেখে বড় পরিসরে উৎপাদনে সহায়তা করে।
শুল্কসুবিধায় প্রতিযোগিতার সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ককাঠামো বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। শরিফ জহিরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কহার প্রায় এক শতাংশ বেশি। ফলে শুল্কের ব্যবধান সীমিত থাকায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও পণ্যের মান উন্নত করতে পারলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেলও তুলনামূলক শুল্ক অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, চীনের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে শুল্কের পার্থক্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পণ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুল্কসুবিধাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের মান, নকশার বৈচিত্র্য এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এই সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন হবে।
দীর্ঘ সরবরাহসময় বড় বাধা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগা। শরিফ জহির জানান, গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে প্রায় ৩০ দিন লাগে। এর সঙ্গে কাস্টমস ছাড়পত্রের জন্য অতিরিক্ত সময়ও ব্যয় হয়।
ভিয়েতনাম ও মিশরের মতো প্রতিযোগীরা তুলনামূলক দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে। ফ্যাশনশিল্পে ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য সরবরাহের সময় কমানো জরুরি। এ জন্য বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং উৎপাদন থেকে জাহাজীকরণ পর্যন্ত সময় কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি পলিয়েস্টার ও নাইলনের মতো কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন শরিফ জহির। এ খাতে প্রয়োজনীয় কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
আট মাসে রপ্তানি কম, আগস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অফিসের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে দেশটির মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ৪৯ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যার মূল্য ৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
তবে আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে। সামগ্রিক বাজারে আমদানি কমলেও এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। শরিফ জহির জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে শরৎ মৌসুমের অর্ডারের কাজ শেষ হয়েছে এবং বসন্ত ও পরবর্তী গ্রীষ্ম মৌসুমের অর্ডার নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
ট্রাম্পের পরা বাংলাদেশে তৈরি স্যুট দেশের পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। তবে এই পরিচিতিকে দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে শুল্কসুবিধার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন পণ্যে বিনিয়োগ এবং দ্রুত সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে এসব সুযোগ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তার ওপর।
সন্ধানী বার্তা/ওয়াইএ/এমকে