ভ্রমণ

বিশ্ব পর্যটন সূচকে বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থান

বিশ্বের পর্যটন উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৬ সালের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে (টিটিডিআই) ১১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম। সাতের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৩ দশমিক ৩৪। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

দুই বছর পরপর প্রকাশিত এ সূচকে পর্যটন খাতের উন্নয়ন, অবকাঠামো, নিরাপত্তা, ব্যবসার পরিবেশ, মানবসম্পদ, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং টেকসই পর্যটনের মতো বিষয় মূল্যায়ন করা হয়। জুরিখ ইনস্যুরেন্স গ্রুপের সহযোগিতায় ২০২৬ সালের সূচক প্রকাশ করেছে ডব্লিউইএফ।

শীর্ষে জাপান, দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্র

২০২৬ সালের সূচকে ৫ দশমিক ২৭ স্কোর নিয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে জাপান। আগের সূচকে শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এবার ৫ দশমিক ২৩ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে। এরপর রয়েছে স্পেন, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স। দেশগুলোর স্কোর যথাক্রমে ৫ দশমিক ২২, ৫ দশমিক ১৮ ও ৫ দশমিক ১৭।

শীর্ষ দশে আরও রয়েছে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, চীন, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি। সূচকের শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে ১৯টিই উচ্চ আয়ের অর্থনীতি। পর্যটনসেবা, পরিবহন ও অবকাঠামো, আকাশপথে যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকায় এসব দেশ বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।

বৈশ্বিক উন্নতির তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১১০টি অর্থনীতির মধ্যে ১০১টির স্কোর বেড়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৯২ শতাংশ দেশের পর্যটন উন্নয়ন পরিস্থিতিতে অগ্রগতি হয়েছে। এ সময়ে বৈশ্বিক গড় স্কোর বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশের স্কোর বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কম।

এ চিত্র বলছে, বাংলাদেশের পর্যটন খাতে কিছু অগ্রগতি হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন, সমুদ্রসৈকত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মতো সম্পদ থাকলেও সেগুলোকে পর্যটনবান্ধব সেবা ও অবকাঠামোর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

পর্যটন উন্নয়নে অবকাঠামো ও সেবার গুরুত্ব

টিটিডিআই সূচকটি পাঁচটি মাত্রা, ১৭টি স্তম্ভ ও ১০২টি সূচকের ভিত্তিতে তৈরি। এতে ব্যবসার পরিবেশ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা, মানবসম্পদ ও শ্রমবাজার, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির প্রস্তুতি, পর্যটনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয় এবং পর্যটনের জন্য উন্মুক্ততা মূল্যায়ন করা হয়।

এ ছাড়া মূল্য প্রতিযোগিতা, পর্যটন অবকাঠামো ও সেবা, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নও সূচকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে কোনো দেশের পর্যটন সম্ভাবনা থাকলেই উচ্চ অবস্থানে পৌঁছানো যায় না; পর্যটকদের যাতায়াত, নিরাপত্তা, আবাসন, সেবা ও সামগ্রিক অভিজ্ঞতার মানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডব্লিউইএফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ১৭টি স্তম্ভের মধ্যে ১৪টির গড় স্কোর বেড়েছে। সাংস্কৃতিক সম্পদ, পর্যটন অবকাঠামো ও সেবা এবং আকাশপথে যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। একই সময়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির প্রস্তুতিও উন্নত হয়েছে।

ব্যয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ

বৈশ্বিক পর্যটন খাতে অগ্রগতির পাশাপাশি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। পর্যটন পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগের ঘাটতি, দক্ষ জনবলের অভাব এবং পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ খাতটির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সূচকে থাকা প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অর্থনীতির মূল্য প্রতিযোগিতা কমেছে। অর্থাৎ, পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ ও সংশ্লিষ্ট সেবার ব্যয় অনেক দেশের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পর্যটন অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে পর্যটন উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সূচকের তুলনায় রয়েছে পদ্ধতিগত সতর্কতা

২০২৬ সালের সূচকের সঙ্গে ২০২৪ সালের ফলাফল সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউইএফ। কারণ, এবারের সংস্করণে তথ্য ও মূল্যায়নপদ্ধতিতে কিছু সংশোধন আনা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ফলাফলও নতুন পদ্ধতিতে পুনর্গণনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের তালিকায় থাকা বার্বাডোস, কম্বোডিয়া, ইরান, লেবানন, মলদোভা, মন্টেনেগ্রো, তাজিকিস্তান, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং ভেনেজুয়েলা ২০২৬ সালের তালিকায় নেই। নতুন কোনো অর্থনীতিও যুক্ত হয়নি।

সব মিলিয়ে, পর্যটন খাতে বৈশ্বিক অগ্রগতির মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর বাড়লেও আন্তর্জাতিক সূচকে অবস্থান শক্তিশালী করতে অবকাঠামো, সেবা, নিরাপত্তা, দক্ষতা ও বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রগুলোতে আরও মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সূত্র: ডব্লিউইএফ

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর