লাইফস্টাইল

শিশুর মানসিকতা বদলাতে অভিভাবকের করণীয়

শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তাভাবনা, আচরণ ও শেখার ধরনেও পরিবর্তন আসে। তবে বয়স বাড়লেই একটি শিশু আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও বিচক্ষণ হয়ে উঠবে, এমন নয়। তার মানসিক বিকাশে পরিবারের পরিবেশ, অভিভাবকের আচরণ এবং শেখার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছোটবেলা থেকেই ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলে শিশু নতুন কিছু শিখতে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে উৎসাহিত হয়।

মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’ বা বিকাশমুখী মানসিকতা। এই ধারণা অনুযায়ী, নিয়মিত অনুশীলন, প্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের দক্ষতা বাড়তে পারে। ফলে কোনো কাজে ব্যর্থ হলে শিশুর মনে এই ধারণা তৈরি করা জরুরি যে, এখনো কাজটি করতে না পারা মানেই ভবিষ্যতেও তা শেখা সম্ভব নয়—এমন নয়।

চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে শেখান

শিশুরা কোনো কাজে ব্যর্থ হলে অনেক সময় হতাশ হয়ে পড়ে। কেউ কেউ মনে করে, সে হয়তো কাজটি পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে বকাঝকা না করে তাকে বোঝাতে হবে, প্রথমবার সফল না হওয়া শেখার স্বাভাবিক অংশ।

ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া–তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ম্যাকুন্স প্লে স্কুলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাবিদ বিজয় কুমার আগারওয়াল শিশুদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

শিশুর বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি অভিভাবকেরা নিজেরা ভুল করলে কীভাবে তা সংশোধন করেন, সেই উদাহরণও শিশুর সামনে তুলে ধরতে পারেন। এতে শিশু বুঝবে, ভুল হওয়া স্বাভাবিক এবং চেষ্টা চালিয়ে গেলে উন্নতি সম্ভব।

স্থির ও বিকাশমুখী মানসিকতার পার্থক্য বোঝান

স্থির মানসিকতার শিশু মনে করতে পারে, কোনো বিষয়ে তার দক্ষতা কম বলে সে কখনোই সেটিতে ভালো করতে পারবে না। অন্যদিকে বিকাশমুখী মানসিকতার শিশু বিশ্বাস করে, অনুশীলন ও চেষ্টা দিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।

যেমন, গণিতের কোনো অঙ্ক না পারলে শিশুকে ‘তুমি অঙ্কে দুর্বল’ বলার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘তুমি এখনো অঙ্কটি বুঝতে পারোনি, চলো আরেকবার চেষ্টা করি।’ এ ধরনের কথায় শিশুর শেখার আগ্রহ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

শুধু ফল নয়, প্রচেষ্টারও প্রশংসা করুন

শিশু ভালো ফল করলে তাকে উৎসাহ দেওয়া জরুরি। তবে শুধু নম্বর বা সাফল্যের প্রশংসা না করে তার চেষ্টা, ধৈর্য, মনোযোগ ও উন্নতির দিকগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

অনেক চেষ্টা করেও পরীক্ষায় প্রত্যাশিত নম্বর না পেলে শিশুকে হতাশ না করে বোঝানো যেতে পারে, কোথায় আরও অনুশীলন প্রয়োজন এবং পরেরবার কীভাবে প্রস্তুতি নিলে ভালো করা সম্ভব।

প্রশংসা হতে হবে বাস্তবসম্মত ও নির্দিষ্ট। যেমন, ‘তুমি কঠিন অঙ্কটি সমাধানের জন্য বারবার চেষ্টা করেছ’—এভাবে বললে শিশু বুঝতে পারে, কোন প্রচেষ্টাগুলো তাকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখান

শিশুর ভুল বা ব্যর্থতার সময় অভিভাবকের প্রতিক্রিয়া তার আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে। ভুলের জন্য অপমান করা কিংবা অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করার পরিবর্তে কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা বুঝতে সাহায্য করা উচিত।

কোনো কাজে ব্যর্থ হলে শিশুর সঙ্গে আলোচনা করুন—কেন এমন হলো, কী শেখা গেল এবং পরেরবার কীভাবে ভিন্নভাবে চেষ্টা করা যায়। প্রয়োজনে কাজটিকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে দিন, যাতে শেখার প্রক্রিয়াটি সহজ হয়।

এতে শিশু বুঝতে শিখবে, ব্যর্থতা তার যোগ্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বরং কৌশল পরিবর্তন ও দক্ষতা বাড়ানোর একটি সুযোগ।

নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তৈরি করুন

বিকাশমুখী মানসিকতা গড়ে তুলতে শিশুকে নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করানো দরকার। ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া, খেলাধুলা, ধাঁধা সমাধান কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

কোনো কাজ শুরুতে কঠিন মনে হলেও শিশুকে ধীরে ধীরে চেষ্টা করতে উৎসাহিত করুন। তবে তার আগ্রহ, বয়স ও সামর্থ্য বিবেচনায় নিতে হবে। অতিরিক্ত চাপ দিয়ে কোনো কিছু শেখানোর চেষ্টা করলে উল্টো অনীহা তৈরি হতে পারে।

নতুন কিছু শেখার সময় ভুল করা স্বাভাবিক—এই ধারণা শিশুর মধ্যে তৈরি হলে অপরিচিত কাজের ভয় কমতে পারে। একই সঙ্গে সে নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতা আবিষ্কারের সুযোগ পায়।

অভিভাবকের আচরণই হতে পারে উদাহরণ

শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, বড়দের আচরণ দেখেও অনেক কিছু আয়ত্ত করে। তাই অভিভাবকদের নিজেদের ভুল স্বীকার করা, নতুন কিছু শেখা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কোনো কাজ কঠিন মনে হলে সেটি এড়িয়ে না গিয়ে কীভাবে সমাধান করা যায়, তা শিশুর সামনে আলোচনা করুন। এতে সে বুঝবে, শেখার সুযোগ সব সময় থাকে এবং দক্ষতা বাড়ানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবর্তনে সময় দিন

শিশুর মানসিকতা এক দিনে বদলে যায় না। নিয়মিত উৎসাহ, ধৈর্য, বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা এবং নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার মধ্যে বিকাশমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব।

শিশুকে সব সময় সফল হওয়ার চাপ না দিয়ে চেষ্টা করার সুযোগ দিন। ভুল করলে তাকে ছোট না করে শেখার পথ দেখান। মনে রাখতে হবে, কোনো কিছু এখনো না পারা মানেই এই নয় যে, সে কখনোই তা শিখতে পারবে না। এই বিশ্বাস শিশুর আত্মবিশ্বাস, শেখার আগ্রহ এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

সন্ধানী বার্তা/এসএ


সম্পর্কিত খবর