কম্পিউটার প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের বিস্তারে হারিয়ে যেতে বসেছে হাতে আঁকা সাইনবোর্ড ও দেয়াললিখনের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। একসময় হাটবাজারের দোকান, রাস্তার পাশের সাইনবোর্ড, যানবাহন কিংবা ঘরের দেয়ালে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠত নানা নকশা ও লেখা। সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রায় কাজ হারাচ্ছেন হাতে আঁকা শিল্পীরা। তাঁদেরই একজন লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার প্রবীণ শিল্পী মোহাম্মদ মুজাহিদ হোসেন। চার দশক ধরে রং-তুলিকে সঙ্গী করে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন সংসার চালানোই তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
কমলনগরের ফজুমিয়ার হাট বাজারে কাজ করেন মুজাহিদ হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে হাতে সাইনবোর্ড লেখা, নকশা আঁকা ও বিভিন্ন যানবাহনে রং করার কাজ করে আসছেন তিনি। একসময় এসব কাজের জন্য তাঁর মতো দক্ষ শিল্পীদের ওপর নির্ভর করতেন ব্যবসায়ী ও যানবাহনের মালিকেরা। কিন্তু ডিজিটাল ব্যানার, ফ্লেক্স প্রিন্টিং ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে সেই চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে।
আক্ষেপ করে মুজাহিদ হোসেন বলেন, ডিজিটাল ব্যানার আর ফ্লেক্স প্রিন্টিংয়ের ভিড়ে তাঁদের মতো শিল্পীদের কদর আর আগের মতো নেই। বড় ব্যানার, বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ড তৈরির কাজ এখন যন্ত্রের মাধ্যমে করা হচ্ছে। ফলে হাতে লেখার কাজ কমে গেছে। প্রায় ৪০ বছর ধরে যে পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন, সেই পেশাতেই এখন টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু সাইনবোর্ড নয়, বিভিন্ন যানবাহনে নাম লেখা, নকশা আঁকা কিংবা রং করার ক্ষেত্রেও হাতে কাজ জানা শিল্পীদের প্রয়োজন হয়। তবে এ ধরনের দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ এখন আগের তুলনায় কম পাওয়া যায়।
স্থানীয় ট্রাক্টর মিস্ত্রি নাজিম উদ্দীন বলেন, ট্রাক্টর বা ট্রলি তৈরি করে রং করার পর লেখার জন্য এখন আর আগের মতো শিল্পী খুঁজে পাওয়া যায় না। হাতে সুন্দর করে লেখার কাজ জানেন, এমন মানুষও ক্রমেই কমে আসছেন।
প্রযুক্তির পরিবর্তনে বড় সাইনবোর্ড ও দেয়াললিখনের কাজ কমে গেলেও পেশা ছেড়ে দেননি মুজাহিদ হোসেন। পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে এখনো রং-তুলিকেই জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে ধরে রেখেছেন তিনি।
বড় কাজ না পেয়ে এখন ট্রলি, ট্রাক, টেম্পু, ইজিবাইক, অটোরিকশা ও সিএনজির গায়ে নকশা আঁকা কিংবা নাম লেখার কাজ করেন। এসব ছোটখাটো কাজ থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালাতে হয় তাঁকে। কাজের অনিশ্চয়তা আর সীমিত আয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত চলছে তাঁর টিকে থাকার লড়াই।
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় মানুষের কাজের ধরন বদলাচ্ছে। সহজলভ্য ও দ্রুত উৎপাদনযোগ্য ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশার চাহিদা কমে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের চাপে মুজাহিদের মতো শিল্পীরা হারাচ্ছেন কাজের সুযোগ, অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে তাঁদের জীবিকা।
অথচ একসময় তাঁদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পেত দোকানের সাইনবোর্ড, দেয়াল ও বিভিন্ন যানবাহন। হাতে আঁকা এসব শিল্প ছিল স্থানীয় বাজার ও জনজীবনের পরিচিত দৃশ্যের অংশ। এখন সেই শিল্পের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাতে আঁকা সাইনবোর্ড ও দেয়াললিখনের ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি প্রবীণ শিল্পীদের বিকল্প কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে এই লোকশিল্পের অবশিষ্ট চর্চাও।
মুজাহিদ হোসেনের রং-তুলির লড়াই তাই শুধু জীবিকা টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম নয়, বরং প্রযুক্তির পরিবর্তনের মধ্যে হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যকে ধরে রাখার লড়াইও।
সন্ধানী বার্তা/এসকে/এমএসআইপি