দেশজুড়ে

পদ্মা নদীভাঙনের আতঙ্কে কমেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতি,বিকল্প জমির অপেক্ষায় কর্তৃপক্ষ

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খাঁনকান্দি গ্রামের ১২২ নম্বর আলতাফ হোসেন খাঁন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় পদ্মা নদী ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। কিন্তু কয়েক বছরের অব্যাহত ভাঙনে নদী এগিয়ে এসেছে বিদ্যালয়ের মাঠের কাছে। এখন যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।

ভাঙনের আশঙ্কায় খুলে রাখা হয়েছে বিদ্যালয় ভবনের টিন ও বেড়া। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কিছু আসবাব ও প্রয়োজনীয় মালামাল। এর মধ্যেই চলছে পাঠদান। কিন্তু নদীভাঙনের আতঙ্কে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। চলতি শিক্ষাবর্ষে ২১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও প্রতিদিন গড়ে উপস্থিত থাকছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ জন।

আলম খাঁনকান্দি গ্রামটি পদ্মা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত। চারপাশে নদীবেষ্টিত এই জনপদের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌপথ। একসময় এলাকায় কোনো বিদ্যালয় না থাকায় স্থানীয় উদ্যোগ ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় আলতাফ হোসেন খাঁন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খাঁন বিদ্যালয়ের জন্য ৩৩ শতাংশ জমি দান করেন। তাঁর নামেই বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়।

প্রতিষ্ঠার সময় নদী থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার। কিন্তু গত দুই বছরে ওই এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরেই পদ্মা প্রায় এক কিলোমিটার উত্তর দিকে এগিয়ে এসেছে। গত দুই মাসে ভাঙন আরও বাড়ায় নদী এখন বিদ্যালয়ের মাঠের কাছাকাছি।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। ইতোমধ্যে আশপাশের বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে চলে গেছে।

বিদ্যালয়টির পাকা মেঝের টিনশেড ভবনে পাঁচটি কক্ষে পাঠদান করা হয়। তবে নদীভাঙনের আশঙ্কায় ভবনের টিন ও বেড়া খুলে রাখা হয়েছে। কিছু আসবাব ও প্রয়োজনীয় মালামালও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে নিরাপদ স্থানে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই খোলা ঘরে চলছে শিশুদের পড়াশোনা।

গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি কক্ষে একসঙ্গে পড়াচ্ছেন দুজন শিক্ষক। পাশের আরেকটি কক্ষে কয়েকজন শিশুকে পাঠদান করছেন একজন শিক্ষক। সকাল থেকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সেখানে ৬৫ জন শিক্ষার্থীকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এমন পরিস্থিতিতে পাঠদান কত দিন স্বাভাবিকভাবে চলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভবনটি রক্ষার পাশাপাশি বিকল্প স্থানে বিদ্যালয় সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চলতি শিক্ষাবর্ষে বিদ্যালয়টিতে ২১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। কিন্তু নদীভাঙনের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত হচ্ছে না। বিদ্যালয়ের আশপাশের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হওয়ায় অন্তত ১১০ জন শিক্ষার্থী আট থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মনিকা ও জোনায়েদের ভয়, যেকোনো সময় তাঁদের বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। স্কুলটি ভেঙে গেলে কোথায় গিয়ে পড়াশোনা করবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছে তারা।

শিশুদের এই আতঙ্ক শুধু বিদ্যালয় হারানোর আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে নতুন জায়গায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করা, দূরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামীম খান বলেন, এ বছরই এলাকায় সবচেয়ে বেশি ভাঙন হয়েছে। গত দুই মাসে নদী বিদ্যালয়ের মাঠের কাছে চলে এসেছে। প্রতিদিনই তাঁকে দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে চিন্তা হয়, পরদিন এসে বিদ্যালয়টি দেখতে পাবেন কি না। ভাঙনের আশঙ্কায় ইতোমধ্যে কিছু মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও অনেক কমে গেছে। অন্তত ১১০ জন শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে অন্য এলাকায় চলে গেছে বলে জানান তিনি।

শিক্ষকের এই উদ্বেগে স্পষ্ট, নদীভাঙন এখন শুধু বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর জন্য হুমকি নয়; এটি শিশুদের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত করছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খাঁন জানান, বিদ্যালয়ের আশপাশে ভাঙন শুরু হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু এলাকাটি রক্ষায় এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

চলতি বছর আলম খাঁনকান্দি এলাকায় অন্তত ৩৫০টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। এসব পরিবার বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজেদের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। এবার নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে গ্রামের শিশুদের শিক্ষার অন্যতম অবলম্বন বিদ্যালয়টি।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হলে শুধু একটি ভবনই হারাবে না, এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগও আরও সংকুচিত হবে।

জাজিরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান বলেন, পদ্মার তীরবর্তী গ্রামের বিদ্যালয়টি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি তাঁরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। প্রয়োজনে বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। তবে এখনো বিকল্প জমি পাওয়া যায়নি।

তিনি জানান, বিদ্যালয়টি নদীভাঙনের শিকার হলেও যাতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে।

আলম খাঁনকান্দি গ্রামের এই বিদ্যালয়টি একসময় এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু পদ্মার ভাঙনে সেই সুযোগ এখন হুমকির মুখে। বিদ্যালয়ের ভবন সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও বিকল্প জমি না পাওয়ায় সংকটের স্থায়ী সমাধান অনিশ্চিত।

নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও পড়েছে অনিশ্চয়তায়। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর পাশাপাশি ব্যাহত হতে পারে শিশুদের শিক্ষাজীবনও। তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নদীভাঙন থেকে বিদ্যালয় রক্ষা এবং প্রয়োজনে দ্রুত বিকল্প স্থানে পাঠদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

সন্ধানী বার্তা/এসকে/এমএসআইপি


সম্পর্কিত খবর