আন্তর্জাতিক

ইমরানের মুক্তির দাবিতে লংমার্চ, পিটিআইকে কড়া হুঁশিয়ারি শাহবাজ সরকারের

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান লংমার্চকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি সারা দেশ থেকে দলের নেতা-কর্মীদের সোয়াবি ইন্টারচেঞ্জে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানানোর পর পিটিআইকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। একই সঙ্গে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি কিংবা গভর্নর শাসন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।

১১ অক্টোবর সোয়াবি ইন্টারচেঞ্জে দলের নেতা-কর্মীদের জমায়েতের আহ্বান জানিয়েছেন সোহেল আফ্রিদি। ওই সমাবেশ থেকে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে পিটিআইকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার বাইরে লংমার্চ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীরা।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিটিআইয়ের আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি নিয়ে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মতপার্থক্য এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। অন্যদিকে, সরকারের মিত্র পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি পিটিআইকে ‘উগ্রবাদী’ রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

জরুরি অবস্থা কিংবা গভর্নর শাসনের সম্ভাবনা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি অথবা গভর্নরের মাধ্যমে প্রদেশের শাসন পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এ নিয়ে ১০ অক্টোবর, শনিবার ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হতে পারে বলে সূত্রের বরাতে জানিয়েছে জিও নিউজ।

বৈঠকে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিবেচনাধীন প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, সাবেক কেন্দ্রশাসিত উপজাতীয় এলাকাসহ খাইবার পাখতুনখাওয়ার ১২টি জেলায় জরুরি অবস্থা জারি করা। পাশাপাশি প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্রের দাবি, খাইবার পাখতুনখাওয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ থেকে ২৩৪ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে গভর্নর শাসনকে একেবারে শেষ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি।

এখন পর্যন্ত এসব পদক্ষেপের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে জরুরি অবস্থা বা গভর্নর শাসন বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

‘উগ্রবাদী’ রাজনীতি ছাড়তে পিটিআইকে বিলাওয়ালের আহ্বান

পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনার মধ্যে পিটিআইয়ের আন্দোলন ও রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করেছেন বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি। করাচিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে, আজ যাঁরা কারাগারে আছেন, তাঁরা আগামীকাল ক্ষমতায়ও ফিরতে পারেন। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখাই সমস্যার সমাধান নয়।

তবে একই সঙ্গে পিটিআইকে তাদের ‘উগ্রবাদী’ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি। বিলাওয়ালের মতে, সংঘাত ও মুখোমুখি অবস্থানের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত পিটিআইয়ের নিজেদেরই ক্ষতি করছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পথ অব্যাহত রাখলে ইমরান খান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ১৪ বছরের কারাবাসের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারেন। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, রাজনৈতিক সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে গেলে ইমরানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির সমালোচনা করে বিলাওয়াল তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক রাজনীতির অভিযোগ তোলেন। তাঁর মতে, পিটিআইয়ের সংঘাতমুখী অবস্থান রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে এবং দলটির জন্যই তা ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।

সোয়াবি ইন্টারচেঞ্জে জমায়েতের ডাক আফ্রিদির

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পিটিআই। দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নেতা-কর্মীরা খাইবার পাখতুনখাওয়ার সোয়াবি ইন্টারচেঞ্জে জড়ো হবেন। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।

ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়ার চরসদ্দারে লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সোহেল আফ্রিদি বিভিন্ন অঞ্চলের গাড়িবহরের কর্মসূচি তুলে ধরেন। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, পেশোয়ার ও মালাকান্দ ডিভিশন থেকে গাড়িবহর ১৩ অক্টোবর সোয়াবি ইন্টারচেঞ্জে পৌঁছাবে। একই দিনে হাজারা ডিভিশনের জন্যও পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোহাট ডিভিশন থেকেও গাড়িবহর সোয়াবি ইন্টারচেঞ্জে পৌঁছাবে। অন্যদিকে বান্নু ও ডেরা ইসমাইল খান ডিভিশন থেকে আসা গাড়িবহর চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) সড়ক ব্যবহার করে লংমার্চে যোগ দেবে।

আফ্রিদি জনগণকে ‘হককি আজাদি’ বা প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে ইমরান খানের মুক্তির দাবির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধেও আন্দোলন জোরদার করার ইঙ্গিত রয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

২০২২ সালে ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের সামনে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরতে চান বলে জানিয়েছেন সোহেল আফ্রিদি।

তাঁর দাবি, সরকার পরিবর্তনের ওই ঘটনার পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচকে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। আফ্রিদির ভাষ্য, বন্ধ দরজার আড়ালে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পরিণতি এখন দেশকে ভোগ করতে হচ্ছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০০৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রদেশটিতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ১৪ হাজার অভিযান এবং ২২টি বড় সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এত অভিযান সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

আফ্রিদির বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ার সাধারণ মানুষ, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়ত প্রাণ দিচ্ছেন। ফলে প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা

ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দী। তাঁর দল পিটিআইয়ের দাবি, তাঁকে অবৈধভাবে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর মুক্তির দাবিতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। তবে নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে কর্মসূচি পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করার কথা জানানো হয়।

লংমার্চ শুরুর আগে সরকারি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পিটিআইয়ের প্রতিনিধিরা দুই দফা আলোচনায় বসেছিলেন। কিন্তু ওই আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও ইমরানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে অনড় রয়েছে দলটি।

এদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে লংমার্চের পরিধি নিয়ে সতর্কবার্তা আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে পিটিআই প্রাদেশিক নেতৃত্বের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

১১ অক্টোবর সোয়াবি ইন্টারচেঞ্জে জমায়েত এবং পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জরুরি অবস্থা বা গভর্নর শাসন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত এবং পিটিআইয়ের পরবর্তী আন্দোলন—দুইয়ের ওপরই নির্ভর করছে এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার পরবর্তী গতিপথ।

সন্ধানী বার্তা/এসএ

 


সম্পর্কিত খবর