‘আমি নিজেও একজন শিক্ষক। কাজেই আপনাদের দাবির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত।’—শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের দাবির প্রসঙ্গে নিজের পরিচয় ও অবস্থান এভাবেই স্পষ্ট করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তবে শিক্ষক হিসেবে দাবিটির প্রতি তাঁর সমর্থনের পাশাপাশি জাতীয়করণের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, জাতীয়করণ হলে শিক্ষকেরা সরকারি কর্মচারীতে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি বদলি, প্রশাসনিক দায়িত্বসহ নতুন কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন। তাই দাবিটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নরসিংদীর পলাশ উপজেলা মাল্টিপারপাস অডিটোরিয়ামে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আবদুল মঈন খান এসব কথা বলেন।
- ‘আমি নিজেও একজন শিক্ষক, আপনাদের দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত’
- জাতীয়করণের আগে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভাবার পরামর্শ
শিক্ষক পরিচয়েই দাবির প্রতি সংহতি
শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবির প্রসঙ্গে মন্ত্রীর নিজের শিক্ষক পরিচয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি নিজেই জানালেন, তিনি একজন শিক্ষক। ফলে দাবিটির প্রতি তাঁর সমর্থন এসেছে কেবল সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে নয়, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার সঙ্গেও সম্পর্কিত অবস্থান থেকে। ড. মঈন খান বলেন, ‘আমি নিজেও একজন শিক্ষক। কাজেই আপনাদের দাবির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত।’
তবে তিনি জাতীয়করণের বিষয়টিকে শুধু সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, জাতীয়করণের সঙ্গে চাকরির ধরন ও দায়িত্বের পরিবর্তনও যুক্ত হবে। শিক্ষকেরা সরকারি কর্মচারীতে পরিণত হলে বদলি ও প্রশাসনিক দায়িত্বসহ বিভিন্ন বিষয় সামনে আসবে। তাই দাবিটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিক্ষকদের নিজেদেরও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
সমর্থনের সঙ্গে বাস্তবতার কথাও
মন্ত্রীর বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি দিক স্পষ্ট হয়েছে—শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন এবং জাতীয়করণের সম্ভাব্য প্রশাসনিক প্রভাব সম্পর্কে সতর্কতা। অর্থাৎ জাতীয়করণ হলে শুধু বেতন-ভাতা কিংবা চাকরির নিশ্চয়তাই বাড়বে না; এর সঙ্গে সরকারি চাকরির কাঠামো, বদলি এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের বিষয়ও যুক্ত হতে পারে। এই কারণেই শিক্ষকদের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা কীভাবে অক্ষুণ্ন রাখা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মন্ত্রী।
দেশের সম্পদ সীমিত হলেও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার কখনো কার্পণ্য করবে না বলেও তিনি জানান। শিক্ষকদের কল্যাণ ও তাঁদের ন্যায্য দাবির বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
সরকারি সহায়তা বেড়েছে ধাপে ধাপে
বেসরকারি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ইতিহাস তুলে ধরে ড. মঈন খান বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল বেসরকারি। ব্যক্তি ও সমাজের দানশীল মানুষের সহযোগিতায় এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতো। পরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতায় সরকারি সহায়তা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়।
মন্ত্রী বলেন, ১৯৮০ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের বেতনের ৫০ শতাংশ সরকারিভাবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবির প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষকদের সরকারি বেতন-সহায়তা আরও বাড়ানো হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০০১ সালে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের বেতনের শতভাগ সরকারিভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে বর্তমানে দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সরকারি সহায়তার আওতায় রয়েছেন।
শিক্ষক গড়েন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ
নিজের শিক্ষক পরিচয়ের প্রসঙ্গটি যেন মন্ত্রীর বক্তব্যের অন্য অংশগুলোকেও আলাদা মাত্রা দিয়েছে। শিক্ষকদের দায়িত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষকরাই দেশের তরুণ সমাজকে গড়ে তোলেন। তাই শিক্ষকদের নিজেদের পেশাগত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও দায়িত্বের গুরুত্ব উপলব্ধি করে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে ড. মঈন খান বলেন, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে না। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজই একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে। তাই বাংলাদেশকে উন্নত ও সম্মানজনক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
নারী শিক্ষার প্রসারেও পুরোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব
নারী শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রায় ৩৫ বছর আগে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রথমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর ফলে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিও ওই ধরনের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের সুফল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খান ফাউন্ডেশন ও দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট রোখসানা খন্দকার। পলাশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইশতিয়াক আহমেদের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সন্ধানী বার্তা/আরআই/এমকে