দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নতুন কোনো ‘যৌথ অভিযান’ নয়—বরং নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনারই অংশ। পুলিশ, বিজিবি, এসআরপি ও আনসার বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর এই প্রক্রিয়া সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক দমনে অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে এর পরিধি বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের ‘শুভারম্ভ ফলক’ উন্মোচন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি এসব কথা বলেন।
এই প্রেস ব্রিফিংয়ে তাই শুধু আনসারের নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের আনুষ্ঠানিকতা নয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও একসঙ্গে সামনে এসেছে—বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম, সদস্যদের জবাবদিহি, আনসারের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে ‘যৌথ অভিযান’ নিয়ে মন্ত্রীর স্পষ্টীকরণই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ—আলাদা কোনো অভিযান কাঠামোর ঘোষণা নয়, বিদ্যমান সমন্বিত ব্যবস্থাকেই আরও সক্রিয় করার কথাই বলা হয়েছে।
- সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক দমনে একাধিক বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত
- ডিসেম্বর ঘিরে বাড়তি সতর্কতার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
- আনসারের অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ
‘যৌথ অভিযান’ নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে এর প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, একাধিক বাহিনীর সদস্যকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামানোকে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক ‘যৌথ অভিযান’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এরচেয়ে বাহিনীগুলোর নিজ নিজ সক্ষমতা ও দায়িত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে অপরাধ দমনের যে কার্যক্রম চলছে, সেটিই অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়কে কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এখানে মূল বিষয়টি অভিযানটির নাম নয়, বরং মাঠপর্যায়ে বাহিনীগুলোর সমন্বিত সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে—সেটি।

আনসারের সদর দপ্তরে বদলাচ্ছে অবকাঠামো
প্রেস ব্রিফিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আনসার ও ভিডিপির দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটানোর উদ্যোগ। খিলগাঁওয়ে বর্তমান সদর দপ্তরের জায়গা অপর্যাপ্ত এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই বাস্তবতায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ৩ দশমিক ৪২৮ একর, অর্থাৎ প্রায় ১১ বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে নতুন সদর দপ্তরের জন্য। তেজগাঁওয়ে নির্মিতব্য এই অবকাঠামোতে একটি বৃহৎ ও আধুনিক প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সদর দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা শুধু জায়গার সংকটের সঙ্গে যুক্ত নয়। দেশের অন্যতম বৃহৎ বাহিনীর প্রশাসনিক কার্যক্রম, সদস্যদের অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।
৬০ লাখ প্রশিক্ষিত জনশক্তির বিস্তৃতি
আনসার ও ভিডিপির জনবল কাঠামোর যে চিত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তাতে বাহিনীটির ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার ব্যাটালিয়ন আনসার ও ৬০ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য রয়েছেন। এর বাইরে ৩৫ হাজার ভিডিপি দলনেতার অধীনে রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ প্রশিক্ষিত জনশক্তি। নিয়মিত ও অনিয়মিত সদস্য মিলিয়ে এটিকে দেশের সর্ববৃহৎ ফোর্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী।
ফলে এই বাহিনীর অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে শুধু দাপ্তরিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। মাঠপর্যায়ে এত বড় জনবল কাঠামো পরিচালনা ও সমন্বয়ের জন্য প্রশাসনিক অবকাঠামোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের আবাসন সংকট মোকাবিলায় আশুলিয়া ও শেরেবাংলা নগরেও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অপরাধে জড়ালে বাহিনীর সদস্যরাও ছাড় পাবেন না
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি কিংবা অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ক্ষেত্রেও মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল সরাসরি। প্রমাণ পাওয়া গেলে শুধু প্রত্যাহার নয়, বিভাগীয় আইনি ব্যবস্থা এবং ফৌজদারি মামলা—দুই পথেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির কাঠামোকেও সামনে আনা হয়েছে। অপরাধ দমনে নিয়োজিত সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার ক্ষেত্রেও প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ঢাকার ট্রাফিকে এআইয়ের ব্যবহার
রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সড়ক খনন ও নির্মাণকাজের ধরনেও পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুরো সড়ক একসঙ্গে কেটে দীর্ঘ সময় ফেলে না রেখে খণ্ড খণ্ডভাবে কাজ শেষ করে দ্রুত পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর যানজটের একটি বড় উৎস সড়ক উন্নয়নকাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থাপনার এই দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিসেম্বর ঘিরে বাড়তি নজর
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্যের শেষাংশে ডিসেম্বরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, ‘ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস’; এ সময়ে কোনো অপশক্তিকে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। এই বক্তব্যের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদারের ঘোষণাটি একই ধারায় পড়ছে। অর্থাৎ সামনে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়কে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে।
সন্ধানী বার্তা /এমএএএমকে