সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলোতে চলতি বছর ভয়াবহ হারে বরফ গলেছে। রেকর্ড তাপপ্রবাহ ও শীতকালে কম তুষারপাতের কারণে ২০২৬ সালে দেশটির হিমবাহগুলোর বরফের পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে দেশটির হিমবাহগুলো প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বরফ হারিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রকাশিত সুইস গ্লেসিয়ার মনিটরিং নেটওয়ার্ক (গ্ল্যামোস) এবং সুইস একাডেমি অব সায়েন্সেসের সুইস কমিশন ফর ক্রায়োস্ফিয়ার অবজারভেশনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, হিমবাহ গলার এই গতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং চরম বরফ গলার বছরগুলো প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠছে।
গ্ল্যামোসের পরিচালক ও হিমবিজ্ঞানী ম্যাথিয়াস হাস বলেন, পৃথিবী এখন এমন এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, যেখানে হিমবাহগুলো চোখের সামনে গলে যাচ্ছে। তাঁর মতে, চলতি বছর শীতকালে পর্যাপ্ত তুষার না পড়া এবং গ্রীষ্মে রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে বরফ গলার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
পাঁচ বছরে হারিয়েছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বরফ
সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি উঠে এসেছে দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানে। ২০২১ সালের পর থেকে দেশটির হিমবাহগুলোর মোট বরফের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। ২০২৬ সালের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষতি এই ধারাবাহিকতাকে আরও তীব্র করেছে।
এবারের বরফ গলার হার রেকর্ডের দিক থেকে ২০২২ সালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তবে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের জায়গা হলো, অতিরিক্ত বরফ গলার ঘটনা এখন একবারের ব্যতিক্রম হয়ে থাকছে না। প্রায় প্রতিবছরই চরম পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
২০২২ সালে উত্তর আফ্রিকা থেকে উড়ে আসা ধুলোর কণা তুষারের ওপর জমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছিল। ধুলোর কারণে বরফ সূর্যের আলো কম প্রতিফলিত করে বেশি তাপ শোষণ করেছিল। ফলে সে বছর হিমবাহ গলার হার ছিল নজিরবিহীন।
আলেৎশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গলন
সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় হিমবাহ আলেৎশ এবার সবচেয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। চলতি বছর হিমবাহটির বরফ গলার হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আর গ্লেসিয়ার দ্য সঁফ্লেরঁ-এর গড় পুরুত্ব কমেছে চার মিটারের বেশি। দেশটির বিভিন্ন হিমবাহে গড় পুরুত্ব ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত কমেছে। কিছু হিমবাহের নির্দিষ্ট অংশে পুরুত্ব কমেছে প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত।
কয়েক বছর আগেও এমন মাত্রার পরিবর্তন কল্পনা করা কঠিন ছিল বলে জানিয়েছেন ম্যাথিয়াস হাস।
তিন মাসে হারাল ২.২ ট্রিলিয়ন লিটার পানি
বরফ গলার পরিমাণ বোঝাতে বিজ্ঞানীদের দেওয়া আরেকটি হিসাব আরও চমকে দেওয়ার মতো।
শুধু চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন লিটার পানি হারিয়েছে। পরিমাণটি দেশটির পরিবারগুলোর এক বছরের পানীয় জলের ব্যবহারের চার গুণেরও বেশি।
স্বল্পমেয়াদে হিমবাহ গলার কারণে গ্রীষ্মকালে পানির সংকট কিছুটা কমে। বরফ গলে নদী ও অন্যান্য জলাধারে অতিরিক্ত পানি যোগ হয়। কিন্তু হিমবাহের আয়তন যত কমছে, এই সুবিধাও তত দ্রুত কমে আসছে।
শুধু সুইজারল্যান্ড নয়, ঝুঁকিতে ইউরোপের পানির উৎস
সুইজারল্যান্ডকে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটির পাহাড়ি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন পানি দানিউব, পো, রাইন ও রোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীর প্রবাহে ভূমিকা রাখে। ফলে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ সংকুচিত হওয়ার প্রভাব শুধু দেশটির সীমান্তের মধ্যেই আটকে থাকবে না।
হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে গ্রীষ্মের শুষ্ক সময়ে বরফ গলে নদীতে পানি সরবরাহের ক্ষমতাও কমবে। এতে ভবিষ্যতে পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও জলবিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। সুইজারল্যান্ডের বিদ্যুতের অর্ধেকেরও বেশি জলবিদ্যুৎ থেকে আসে।
বরফের জায়গায় এখন শুধু পাথর
হিমবাহ সংকোচনের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ঢালে। যেসব জায়গা কয়েক বছর আগেও বরফে ঢাকা ছিল, সেসব জায়গায় এখন বেরিয়ে এসেছে পাথর।
ম্যাথিয়াস হাস বলেন, হিমবাহ কত দ্রুত গলছে, বিজ্ঞানীরা তা জানেন। তাই বরফ গলার পরিমাণ দেখে তাঁরা খুব একটা অবাক হন না। কিন্তু পাহাড়ের যেসব জায়গায় আগে তুষার ছিল, সেখানে এখন শুধু পাথর দেখা যাওয়ার দৃশ্য তাঁকে কষ্ট দেয়।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে এমন কিছু ছোট হিমবাহেরও সন্ধান মিলেছে, যেগুলো কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। একটি ছোট হিমবাহ গত দুই দশকে তার প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকা হারিয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
‘চরম বছর’ এখন প্রায় প্রতিবছর
ম্যাথিয়াস হাসের মতে, কয়েক বছর আগেও একটি অস্বাভাবিক গরম বছরকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই ব্যতিক্রমই যেন নিয়মে পরিণত হচ্ছে।
এবারের পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দুটি বড় কারণ—শীতকালে কম তুষারপাত এবং গ্রীষ্মে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা। তুষারের স্তর শুধু হিমবাহকে নতুন বরফ দেয় না, পুরোনো বরফকেও সূর্যের তাপ থেকে কিছুটা রক্ষা করে। তাই শীতে তুষার কম হলে গ্রীষ্মে হিমবাহের পুরোনো বরফ সরাসরি গলনের মুখে পড়ে।
গবেষকদের আশঙ্কা, তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আল্পসের অনেক হিমবাহ দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে না।
সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ে তাই এখন পরিবর্তনটা শুধু বরফের পরিমাণে নয়, দৃশ্যপটেও। যে পাহাড়গুলো একসময় সাদা বরফে ঢাকা থাকত, সেখানে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে পাথর। আর সেই বদলে যাওয়া দৃশ্যই যেন জানিয়ে দিচ্ছে—হিমবাহের সংকট আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি এখন চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বাস্তবতা।
সন্ধানী বার্তা/জেএন