এক্সক্লুসিভ

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

সাত বছরের মাহিদা আক্তার স্কুলে যাওয়ার বয়সী শিশু। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে তাকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত মিলেছে; অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। একই দিনে বাগেরহাটের মোল্লাহাটে সাত বছরের মুসলিমা খাতুনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। এর আগে জামালপুরের মাদারগঞ্জে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছিল সাত বছরের মরিয়ম বুশরা।

  • একের পর এক ধর্ষণ, হত্যা ও নিখোঁজের ঘটনায় আতঙ্ক
  • পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষা বলয় ভেঙে পড়ছে
  • প্রকাশের বাইরেই থেকে যাচ্ছে আরও বহু ঘটনা

তিন দিন পর উদ্ধার হয় তার মরদেহ। পুলিশ বলেছে, ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে মরদেহ মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল। ঘটনাগুলো আলাদা জেলার, আলাদা পরিবারের। কিন্তু নির্মমতার ধরন প্রায় একই। ভুক্তভোগী শিশু। বয়স সাত। আর তিন ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার স্বাভাবিক বলয় ভেঙে গেছে। প্রশ্নটি তাই ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে—কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ জায়গা কোথায়?

পরিসংখ্যানের আড়ালে শিশুর মুখ
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর কিংবা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে। শুধু আগস্টেই ৩৬ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অন্তত পাঁচ কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিভিন্ন ঘটনায় ৩৬ কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছে।

পরিসংখ্যানগুলো অবশ্য পুরো চিত্র নয়। কারণ এসব তথ্যের বড় অংশই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা কিংবা সংগৃহীত অভিযোগের ওপর নির্ভরশীল। পরিবার, সামাজিক চাপ, ভয়, প্রভাবশালীদের হুমকি কিংবা ‘সম্মান’ রক্ষার মানসিকতায় অনেক ঘটনা প্রকাশই পায় না। ফলে প্রকাশিত সংখ্যার বাইরে থাকা নীরব সহিংসতার পরিমাণ কত—তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।

নিখোঁজ মানেই নতুন আশঙ্কা
কন্যাশিশুদের নিরাপত্তার সংকট শুধু ধর্ষণ বা হত্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও পরিবারগুলোর জন্য তৈরি করছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। মুনঅ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সক্রিয় ২৫৪টি নিখোঁজ অ্যালার্টের মধ্যে ৩৭টি কন্যাশিশুর। তাদের পরিবার এখনো অপেক্ষায়। কারও সন্ধান মিলবে কি না, তারা জীবিত আছে কি না—এই অনিশ্চয়তাই হয়ে উঠেছে স্বজনদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে সাত বছরের এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর পরিত্যক্ত ঘর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ বলেছে, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল। নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী আমেনা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয় ফসলের ক্ষেত থেকে। এসব ঘটনা দেখায়, নিখোঁজের প্রতিটি অভিযোগকে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা কতটা জরুরি।

অপরাধের বয়স কমছে, নিরাপত্তা বাড়ছে না
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নিপীড়ন, দৈহিক নির্যাতন, আঘাত, অঙ্গহানি এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো অপরাধ ঘটছে। ভুক্তভোগীদের বয়স পাঁচ থেকে ১৫-১৬ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ যে বয়সে শিশুর প্রধান নিরাপত্তা বলয় হওয়ার কথা পরিবার, স্কুল ও সমাজ—সেই বয়সেই তারা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার লক্ষ্য হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছু তদন্তে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, মোবাইলে রিলস ও উত্তেজক কনটেন্ট দেখার প্রবণতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আচরণগত নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি বিকৃত মানসিকতা ও অপরাধপ্রবণতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে কোনো প্রযুক্তি বা কনটেন্টকে একক কারণ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। অপরাধের দায় শেষ পর্যন্ত অপরাধীরই। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, অনলাইন নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাগুলোও আলাদা করে দেখতে হবে।

২০২৫-এর চিত্রও ছিল ভয়াবহ
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে ধর্ষণের শিকার ৭৮৬ জনের মধ্যে ৫৪৩ জনই কন্যাশিশু। ওই বছর ১৭৯ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়, যার মধ্যে ১০৪ জন কন্যাশিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৩১ জনকে—তাদের মধ্যে ১৮ জন কন্যাশিশু।

একই সময়ে ১৮৮ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হন; তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জন কন্যাশিশু। যৌন নিপীড়নের শিকার ১৬৯ জনের ১১২ জনই কন্যাশিশু। সাইবার সহিংসতার শিকারও হয়েছে ছয় কন্যাশিশু। এক বছরের তথ্যই দেখিয়ে দেয়, এটি বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের ধারাবাহিকতা নয়। বরং শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার একাধিক ধরন একই সঙ্গে সক্রিয়।

নীরবতাই অপরাধীর শক্তি
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. মাখদুমা নার্গিসের মতে, কন্যাশিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, যৌন সহিংসতার পাশাপাশি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেও শিশুরা হত্যা ও নিখোঁজের শিকার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক নীরবতা, ভিকটিম ব্লেমিং, প্রভাবশালীদের চাপ এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে।

এই বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রকাশিত ঘটনা আর প্রকৃত ঘটনার মধ্যে ব্যবধান। কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর পরিবার যদি মামলা করতে ভয় পায়, স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চাপ আসে কিংবা সামাজিক লজ্জার ভয়ে ঘটনা গোপন থাকে, তাহলে অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।

নিরাপত্তা শুধু আইনে নয়, প্রয়োগে
কন্যাশিশু সুরক্ষায় দেশে আইন আছে। কিন্তু আইন থাকা আর তার দ্রুত ও কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ষণের অভিযোগে দ্রুত চিকিৎসা, আলামত সংরক্ষণ, শিশুবান্ধব জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্ভরযোগ্য তদন্ত জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়াও হতে হবে দ্রুত ও ভুক্তভোগীবান্ধব।

একই সঙ্গে স্কুল, পাড়া-মহল্লা ও অনলাইন পরিসরে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। অভিভাবকের সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি শিশুদেরও শেখাতে হবে কোথায়, কীভাবে এবং কার কাছে বিপদের কথা জানাতে হবে। মাহিদা, মুসলিমা, বুশরা কিংবা নিখোঁজ ৩৭ কন্যাশিশু—তাঁরা কোনো পরিসংখ্যানের সংখ্যা নন। প্রত্যেকের ছিল পরিবার, স্বপ্ন, স্কুল, বন্ধুত্ব আর ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। রাষ্ট্র যদি শিশুর জন্য নিরাপদ পথ, নিরাপদ প্রতিষ্ঠান ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে ‘শিশু সুরক্ষা’ শব্দটি কাগজেই থেকে যাবে।

টিইকে/এমকে


সম্পর্কিত খবর