সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী বাছাইয়ে প্রায় শেষ ধাপে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ১১টিতে মেয়র পদে প্রার্থীর নাম প্রাথমিকভাবে ঠিক করেছে দলটি। বাকি দুই সিটি—কুমিল্লা ও নবগঠিত বগুড়ায়—একাধিক নাম নিয়ে চলছে যাচাই-বাছাই। তবে ১১ সিটির তালিকাও এখনো চূড়ান্ত নয়। কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার অনুমোদনের পরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। জামায়াতের এই তৎপরতায় সিটি ভোটে দলটির নিজস্ব সাংগঠনিক প্রস্তুতির একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোটভিত্তিক রাজনীতির বাইরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা সমীকরণ তৈরির ইঙ্গিতও রয়েছে।
- ১৩ সিটির মধ্যে দুইটিতে সিদ্ধান্ত ঝুলছে
- মজলিশে শুরার অনুমোদনের পর আসবে জামায়াতের চূড়ান্ত ঘোষণা
আট সিট থেকে ১১
গত ২২ জুন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে প্রথম দফায় আট সিটির প্রার্থী বাছাই করে জামায়াত। ওই তালিকায় ছিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জ। পরে তালিকায় যুক্ত হয় রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ। ১১ আগস্ট রাজশাহীতে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের নাম প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর সিলেটে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির নূরুল ইসলাম বাবুলের নাম ঘোষণা করা হয়। ময়মনসিংহে প্রায় দুই মাস আগে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক শহীদুল্লাহ কায়সারকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। ফলে ১৩ সিটির মধ্যে ১১টিতে দলটির প্রার্থী বাছাই এখন প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন।
তালিকায় কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা
ঢাকা উত্তর সিটিতে মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিকের নাম রয়েছে। চট্টগ্রামে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুরে সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, বরিশালে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল এবং রংপুরে মহানগর আমির এ টি এম আজম খানকে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। খুলনায় মহানগর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এবং নারায়ণগঞ্জে মহানগর আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের নাম রয়েছে।
রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহের জন্যও স্থানীয় সাংগঠনিক নেতৃত্ব থেকেই প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে। তবে এসব নামকে এখনই চূড়ান্ত প্রার্থী বলতে নারাজ জামায়াত। দলের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে ১১ সিটির প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হলেও কেন্দ্রীয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়।
কুমিল্লা-বগুড়ায় থামেনি দৌড়
বাকি দুই সিটিতে সিদ্ধান্ত নিতে তুলনামূলক বেশি সময় নিচ্ছে দলটি। কুমিল্লায় মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মজিবুর রহমান ভূঁইয়া এবং মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মোসলেহ উদ্দিনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
বগুড়ায় সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন সরকারি আজিজুল হক কলেজের সাবেক জিএস আ খ ম আব্দুল মালেক ও শহর জামায়াতের আমির আবিদুর রহমান সোহেল। স্থানীয় জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাওয়া এসব নাম নিয়ে এখনো পর্যালোচনা চলছে। দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থীদের বিষয়ে আরও পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগামী মাসে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় উঠতে পারে।
জোটের রাজনীতিতে ভিন্ন সমীকরণ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসঙ্গে লড়লেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিক দলগুলোর সঙ্গে একই প্রার্থী দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখছে না জামায়াত। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, সিটি নির্বাচনে দলগুলো নিজেদের মতো করে প্রার্থী দেবে। তবে কোনো এলাকায় শরিকরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে একক প্রার্থী দিলে কেন্দ্র থেকে বাধা দেওয়া হবে না। অর্থাৎ স্থানীয় ভোটে দলীয় অবস্থানের পাশাপাশি আসনভিত্তিক সমঝোতার সুযোগও থাকছে।
এর ফলে সিটি নির্বাচনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোটগত হিসাব সরাসরি কার্যকর না-ও হতে পারে। স্থানীয় সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীর পরিচিতি এবং শরিকদের অবস্থান—সব মিলিয়েই তৈরি হতে পারে পৃথক নির্বাচনী সমীকরণ।
শেষ সিদ্ধান্ত শুরার
১৩ সিটির মধ্যে ১১টিতে প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই শেষ করলেও জামায়াত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি। দলটির প্রক্রিয়া অনুযায়ী, মজলিশে শুরার অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। তাই আপাতত জামায়াতের সিটি ভোটের প্রস্তুতিতে তিনটি স্তর স্পষ্ট—১১ সিটে প্রার্থী বাছাই, কুমিল্লা ও বগুড়ায় যাচাই-বাছাই এবং শরিকদের সঙ্গে সম্ভাব্য স্থানীয় সমঝোতার সুযোগ।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে, প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ১১ প্রার্থীর কতজন শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকছেন। একই সঙ্গে কুমিল্লা ও বগুড়ায় কারা দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেটিও নির্ধারণ করবে ১৩ সিটে জামায়াতের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী প্রস্তুতির পরবর্তী ধাপ।
জেএন/এমকে