জাতীয়

চিকিৎসা শিক্ষায় বড় রূপান্তরের পথে এএফএমসি

চিকিৎসা শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ (এএফএমসি)। শুধু পাঠ্যবই আর শ্রেণিকক্ষনির্ভর শিক্ষা নয়—হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, আধুনিক সিমুলেশন প্রযুক্তি, গবেষণা এবং বাস্তবভিত্তিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নিজস্ব ডেডিকেটেড ট্রেনিং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, ক্লিনিক্যাল স্কিলস অ্যান্ড সিমুলেশন ল্যাবরেটরিকে আরও আধুনিক ও বড় পরিসরে নেওয়া, ক্যাডেট সংখ্যা বাড়ানো, একাডেমিক ভবন ও মহিলা ডরমেটরি সম্প্রসারণ—একসঙ্গে একাধিক উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে এএফএমসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

  • নিজস্ব ট্রেনিং হাসপাতাল ও একাডেমিক উৎকর্ষে জোর
  • সম্প্রসারিত সিমুলেশন ল্যাব ও বাড়ছে ক্যাডেট সংখ্যা
  • ১৯তম কাউন্সিল সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সেনাবাহিনী প্রধান ও কাউন্সিল অব দ্য কলেজের চেয়ারম্যান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এএফএমসির ১৯তম কাউন্সিল অব দ্য কলেজ সভায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শ্রেণিকক্ষ থেকে বাস্তব চিকিৎসায়
চিকিৎসা শিক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়। সেই জায়গাটিতেই জোর দিচ্ছে এএফএমসি। সভায় নিজস্ব ডেডিকেটেড ট্রেনিং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ আরও কাঠামোবদ্ধ ও বাস্তবভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি হবে। রোগী ব্যবস্থাপনা, ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণের পরিসরও বাড়বে। অর্থাৎ চিকিৎসক তৈরির প্রক্রিয়ায় শুধু ‘জানা’ নয়, বাস্তবে সেই জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে সিমুলেশন ল্যাব
প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তুতি রয়েছে। বিদ্যমান ক্লিনিক্যাল স্কিলস অ্যান্ড সিমুলেশন ল্যাবরেটরিকে আরও আধুনিক ও সম্প্রসারিত পরিসরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাউন্সিল সভা শেষে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিদ্যমান ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করেন। পরে নতুন স্থানে আধুনিক সিমুলেশন ল্যাবরেটরি নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

চিকিৎসা শিক্ষায় সিমুলেশন প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের বাস্তব রোগীর ওপর কাজ করার আগে বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি অনুশীলনের সুযোগ দেয়। ফলে নতুন ল্যাবরেটরি এএফএমসির ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাড়ছে ক্যাডেট ও পরিসর
শিক্ষার্থী বাড়ানোর পরিকল্পনাও এসেছে নতুন রূপরেখায়। ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যাডেট সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ২৯তম ব্যাচের ক্যাডেট ভর্তি কার্যক্রম নিয়েও সভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ক্যাডেট সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে একাডেমিক ভবন এবং মহিলা ডরমেটরির বর্ধিতাংশ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু শিক্ষার্থী বাড়ানো নয়, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও আবাসন অবকাঠামো তৈরির দিকটিও একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

গবেষণা ও একাডেমিক উৎকর্ষে নতুন নজর
এএফএমসির শিক্ষার মান আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়টি সভায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। সাম্প্রতিক পেশাগত পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনার পাশাপাশি একাডেমিক উৎকর্ষ বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়।

চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে গবেষণার সংযোগ আরও জোরালো করার বিষয়টিও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবর্তিত চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ চিকিৎসক তৈরির পাশাপাশি জ্ঞান ও গবেষণার পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

হাসপাতাল-ল্যাবের পাশাপাশি সবুজ জ্বালানি
এএফএমসির উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থাকে যুক্ত করার এ উদ্যোগ ভবিষ্যৎ ক্যাম্পাস ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

৫৬ ক্যাডেট থেকে এএফএমসি
১৯৯৯ সালের ২০ জুন মাত্র ৫৬ জন মেডিকেল ক্যাডেট নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির মাধ্যমে এএফএমসির একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই ছোট পরিসরের প্রতিষ্ঠান এখন চিকিৎসা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার আরও বিস্তৃত পরিসরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৯তম কাউন্সিল অব দ্য কলেজ সভার সিদ্ধান্তগুলো সেই পরিবর্তনেরই একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরেছে।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সভায় ডিজিএমএস মেজর জেনারেল কাজী মো. রশীদ-উন-নবী, অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হোসাইন আল মোরশেদ, এএফএমসি কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মো. মাসুদুল আলম মজুমদার এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া প্রতিরক্ষা, অর্থ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কাউন্সিলের সদস্য এবং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।

সামনে লক্ষ্য—আরও দক্ষ চিকিৎসক
এএফএমসির সামনের পরিকল্পনায় তাই কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট—আধুনিক একাডেমিক শিক্ষা, বাস্তবভিত্তিক ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর সিমুলেশন, গবেষণা, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বাড়তি ক্যাডেটের জন্য সক্ষমতা তৈরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এএফএমসির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় যেমন পরিবর্তন আসবে, তেমনি ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের দক্ষতা তৈরির পরিসরও বাড়বে। আর সেই লক্ষ্যেই ৫৬ ক্যাডেট দিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রবেশ করছে চিকিৎসা শিক্ষার আরও আধুনিক এক অধ্যায়ে।

সন্ধানী বার্তা/এমএএএমকে


সম্পর্কিত খবর