একদিকে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার মাদক ব্যবসা, অন্যদিকে ৭০ লাখ মানুষের আসক্তি—মাদকের এই হিসাব কেবল অর্থের নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের চিত্র। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাদকসেবীরা বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেন। মাদক নিরাময় কেন্দ্র, এনজিও, সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও সরকারি কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয় আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মাদককে ঘিরে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছে মানস।
এই বিপুল অর্থের পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ সরবরাহব্যবস্থা। মাঠপর্যায়ে খুচরা বিক্রেতারা দৃশ্যমান হলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের বড় একটি অংশ থাকে আড়ালে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
টার্গেট তরুণ প্রজন্ম
মানসের তথ্য বলছে, মাদকাসক্তদের বড় অংশই তরুণ। আসক্তদের ৮০ শতাংশ যুবক এবং ৬৫ দশমিক ২৫ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি। পুরুষ ৮৪ শতাংশ, নারী ১৬ শতাংশ। গবেষণায় মাদকাসক্তদের ৬০ শতাংশ অপরাধে জড়িত এবং ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে মাদক গডফাদারদের ভূমিকা রয়েছে এবং তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সামনে বিক্রেতা, পেছনে নিয়ন্ত্রক
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সিআইডির সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারিদের অনেকে সরাসরি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত না থেকে আড়াল থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের সরবরাহে এসব সিন্ডিকেটের ভূমিকার তথ্য তদন্তে এসেছে।
অবৈধ ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার তথ্যও সংশ্লিষ্ট তদন্তে উঠে এসেছে। কারও কারও বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলার অভিযোগ রয়েছে। ফলে মাদকবিরোধী লড়াইয়ে শুধু খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার নয়, অর্থের উৎস ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাছে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সীমান্ত পেরিয়ে রাজধানীর বাজারে
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তপথ দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ দেশে ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে আসা মাদকের বড় গন্তব্য ঢাকা। রাজধানী থেকে পরে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
পাশাপাশি সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীসহ বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে অন্যান্য মাদক প্রবেশের তথ্য রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার কয়েকটি পয়েন্টও এই নেটওয়ার্কের নজরে রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।
বদলেছে বিক্রির কৌশল
মাদকের বাজার এখন শুধু রাস্তার মোড়, গলি কিংবা নির্দিষ্ট স্পটে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোম সার্ভিস, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও কুরিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমেও মাদক সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। প্রযুক্তির এই ব্যবহার মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের আটটি ক্রাইম জোনের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শ মাদকের স্পট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব এলাকায় সহস্রাধিক খুচরা বিক্রেতা কাজ করছে বলে দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বিশেষ অভিযানেও অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও নেটওয়ার্কের মূল স্তরে পৌঁছানোই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
অভিযানে বড় সাফল্য
মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অবশ্য জোরদার হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে চলমান বিশেষ অভিযানে ৫২ লাখের বেশি ইয়াবা, ৫ হাজার ৬৮৯ গ্রাম হেরোইন, ২ হাজার ৩৬ বোতল ফেনসিডিল এবং ৭ হাজার ৭২৫ কেজির বেশি গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজধানীর মাদক নেটওয়ার্ক ভাঙতে সিআইডিও আলাদা করে কাজ করছে। চার শতাধিক মাদক গডফাদারের মধ্যে ৪০৮ জনের তালিকা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং মানি লন্ডারিং আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
জেনেভা ক্যাম্পে প্রকাশ্য কারবারের অভিযোগ
তবে অভিযানের মধ্যেও রাজধানীর কিছু এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ পুরোপুরি থামেনি। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান হলেও নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একাধিক মাদক মামলার আসামি কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে কারবারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের হওয়া মামলার অন্তত ৬০ শতাংশ মাদককেন্দ্রিক। ফলে অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহের নেটওয়ার্ক, অবৈধ অর্থ এবং স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা—তিন দিকেই একযোগে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হচ্ছে।
মামলার জট, সামনে আরও বড় পরীক্ষা
মাদকসংক্রান্ত মামলার বিচারেও তৈরি হয়েছে চাপ। মানসের হিসাবে দেশে মাদক মামলা ঝুলে আছে সাড়ে তিন লাখ। অন্যদিকে, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিচারাধীন মাদক মামলার সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার বলে জানিয়েছেন। দুই উৎসের পরিসংখ্যানে বড় পার্থক্য থাকায় হালনাগাদ সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত মামলাজট নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। মাদকসংক্রান্ত প্রায় ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার বিচারের জন্য স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়নে অভিযান ও তদন্ত ইতোমধ্যে জোরদার হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো—সীমান্তে চালান ঠেকানো থেকে রাজধানীর খুচরা বাজার বন্ধ করা, দৃশ্যমান বিক্রেতার পাশাপাশি আড়ালের অর্থদাতা ও নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা এবং একই সঙ্গে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা। কারণ মাদকের এই কালো সাম্রাজ্য শুধু কয়েকজন কারবারির ব্যবসা নয়। এর বিস্তার ঠেকানো না গেলে এর আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে বাড়তে থাকবে সামাজিক ও অপরাধগত চাপও।
এম/এএইচ