অর্থনীতি

গ্যাসের চাপে গতি, শিল্পে ফিরছে স্বস্তি

প্রায় দুই মাসের তীব্র জ্বালানি সংকটের পর শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোথাও কোথাও সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় দীর্ঘদিনের উৎপাদন ব্যাঘাত কাটিয়ে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে শিল্পকারখানাগুলোর সামনে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমনটা এখনই বলা না গেলেও সরবরাহ বৃদ্ধির এই পরিবর্তন দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর বড় স্বস্তি এনেছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় রপ্তানি পণ্যের সময়মতো সরবরাহ এবং উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

গাজীপুরে সরবরাহে দৃশ্যমান অগ্রগতি
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির চিত্রটি সবচেয়ে স্পষ্ট। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জেলার শিল্পকারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের সবচেয়ে কঠিন সময়ে সরবরাহ নেমে এসেছিল প্রায় ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুটে। বুধবার তা বেড়ে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে।

চাহিদার তুলনায় এখনও কিছু ঘাটতি থাকলেও সংকটের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে সরবরাহে এই বড় অগ্রগতি উৎপাদন ব্যবস্থায় গতি ফিরিয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বুধবার গাজীপুরের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহকেন্দ্র পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া। তিনি স্প্যারো ফ্যাশন, ডিবিএল গার্মেন্টস, জয়দেবপুর গ্রিড এবং তিতাসের আঞ্চলিক বিপণন কেন্দ্র ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।

নারায়ণগঞ্জেও উৎপাদনে স্বস্তি
গাজীপুরের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানাতেও গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে। শিল্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় সরবরাহ বাড়ায় উৎপাদন প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরেছে। যদিও অঞ্চলভেদে চাপের পার্থক্য রয়েছে, সামগ্রিকভাবে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি শিল্প খাতে আশাবাদ তৈরি করেছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রায় দুই মাস পর কারখানাগুলোতে আগের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। সব অঞ্চলে একই হারে সরবরাহ বাড়েনি, তবে দীর্ঘদিন পর এই উন্নতি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি এনেছে।

এলএনজি সরবরাহে ফিরেছে গতি
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির এই উন্নতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের। গত ২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। এর প্রভাব পড়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সংকটের আগে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এর মধ্যে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে আসত প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি। সংকটের পর আগস্টে গড় সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২২৩ কোটি ঘনফুটে। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ আবার প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটে ফিরে এসেছে। ফলে জাতীয় পর্যায়েও গ্যাস সরবরাহ সংকটপূর্ব অবস্থার কাছাকাছি এসেছে।

উৎপাদনে গতি রপ্তানিতে স্বস্তি
দীর্ঘ সংকটে নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কমে যায় উৎপাদন, বাড়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ব্যয় এবং শিপমেন্ট বিলম্বের ঝুঁকি। এক জরিপে প্রায় ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে অতিরিক্ত ব্যয় এবং একই সংখ্যক প্রতিষ্ঠান শ্রমঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রায় ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শিপমেন্ট বিলম্বের কথাও জানিয়েছে।

এখন গ্যাসের চাপ বাড়ায় এসব ক্ষতি ধীরে ধীরে সামলে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন বাড়লে শ্রমঘণ্টার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও সহজ হবে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বুধবার সকাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। তাঁর মতে, গত দুই মাসের অচলাবস্থা অনেকটাই কেটে যাওয়ায় শিল্প উদ্যোক্তারা স্বস্তি বোধ করছেন।

স্বস্তির ধারা ধরে রাখাই এখন লক্ষ্য
বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতি শিল্প খাতে আশাবাদের নতুন কারণ তৈরি করলেও উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক উন্নতি যেন সাময়িক না হয়। কারণ দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮৬ কোটি ঘনফুট। ফলে সরবরাহ সংকটপূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরলেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে।

তবে দীর্ঘ দুই মাসের অস্থিরতার পর গ্যাসের চাপ বাড়া নিঃসন্দেহে শিল্পের জন্য ইতিবাচক মোড়। কারখানায় উৎপাদন বাড়ার সুযোগ, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি এবং উদ্যোক্তাদের আস্থায় ফেরার এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখন প্রয়োজন সরবরাহের ধারাবাহিকতা।

এম/এএইচ


সম্পর্কিত খবর