এক্সক্লুসিভ

হাসপাতালে মন্ত্রী, নজরে অনিয়ম—স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহির নতুন বার্তা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যেন হাসপাতালের ওয়ার্ডকেই নিজের কর্মক্ষেত্রের একটি অংশ বানিয়ে নিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত উপজেলা—পূর্বঘোষণা ছাড়াই একের পর এক সরকারি হাসপাতালে হাজির হচ্ছেন তিনি। কখনো সকাল সাড়ে ৮টায়, কখনো দুপুরে। ঢুকে পড়ছেন ওয়ার্ডে, কথা বলছেন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে, খোঁজ নিচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সদের উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবার মানের। এমনকি রোগীদের জন্য রান্না করা খাবারের হাঁড়ির ঢাকনা খুলে মানও দেখছেন।

সামনে আসছে হাসপাতালের বাস্তব চিত্র
গত সাত মাসে কম-বেশি ৪০টি সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন মন্ত্রী। এর বড় অংশই ছিল আকস্মিক। পূর্বঘোষণা ছাড়া এসব সফরে সামনে এসেছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার নানা বাস্তবতা। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, রোগীকে বাইরে থেকে ওষুধ বা স্যালাইন কিনতে বলা, হাসপাতালে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাইরে পরীক্ষা করানো, জনবল সংকট, দালালের দৌরাত্ম্য এবং রোগী হয়রানির মতো অভিযোগ পেয়েছেন তিনি।

তবে সমস্যা চিহ্নিত করেই থেমে থাকেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কোথাও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, কোথাও বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ এসেছে, আবার কোথাও মামলা করার কথাও বলেছেন তিনি।

রোগীর কথাই গুরুত্ব পাচ্ছে—সিংগাইর থেকে সাতক্ষীরা
গত ১৪ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায় মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক হাজির হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেখানে চিকিৎসক সংকট, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি রোগীদের কাছ থেকেও সরাসরি সেবার অভিজ্ঞতা জানতে চান তিনি।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় দীর্ঘদিন ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

সরকারি স্যালাইন বাইরে
নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে সরকারি মজুদ থাকা সত্ত্বেও এক রোগীকে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনতে বলা হয়েছিল। বিষয়টি জানতে পেরে রোগীর স্যালাইনের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। একই হাসপাতালে একজন চিকিৎসক ৪৫ মিনিট দেরিতে উপস্থিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী। সরকারি হাসপাতালে যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা যেন রোগীর কাছে পৌঁছায়—এমন বার্তাই উঠে আসে তাঁর এসব পদক্ষেপে।

রোগীর মুখে হাসপাতালের অভিযোগ
গত আগস্টের শেষদিকে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ শোনেন মন্ত্রী। চিকিৎসক ও জনবল সংকট, হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সেবার নানা সীমাবদ্ধতার কথা জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনের পাশাপাশি রোগীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও এ সফরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মুগদায় বার্তা কঠোর
সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে ডেঙ্গু ইউনিটসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শনের সময় বেশ কিছু অনিয়মও তাঁর নজরে আসে। স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘হয় আমি থাকব, না হয় হাসপাতালে অনিয়ম-দুর্নীতি থাকবে।’

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁর হাসপাতাল পরিদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট—দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অনিয়মকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না; সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা থাকবে।

তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও স্থায়ী সংস্কার
মন্ত্রী জানিয়েছেন, গত এক মাসে ২৫টির বেশি হাসপাতাল পরিদর্শন করে চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি পেয়েছেন। তাঁর দাবি, রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসকদের আচরণ, খাবারের মান, বিছানার চাদর, মশারি ও হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা জানা গেছে। তবে স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম কেবল তাৎক্ষণিক শাস্তির মাধ্যমে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, কার্যকর জবাবদিহি, পর্যাপ্ত জনবল এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনও অনিয়ম হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি ও প্রশিক্ষিত তদারকি জনবল তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

নজরদারি থেকে আস্থায়
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ধারাবাহিক হাসপাতাল পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা স্পষ্ট—সরকারি হাসপাতালের সেবা কেমন হচ্ছে, তা শুধু রিপোর্টে নয়, রোগীর বিছানার পাশে গিয়ে দেখারও প্রয়োজন আছে।

মন্ত্রী মাঠে গিয়ে রোগীর কথা শুনছেন, সমস্যাগুলো নিজের চোখে দেখছেন এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহির বার্তা দিচ্ছেন। এখন এই আকস্মিক পরিদর্শনের সঙ্গে যদি নিয়মিত নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যুক্ত হয়, তাহলে হাসপাতাল পরিদর্শন শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একই সঙ্গে এটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে আনার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

এম/এএইচ


সম্পর্কিত খবর