দেশজুড়ে

আলুর দামে ধস, জয়পুরহাটে কোটি টাকার লোকসানের শঙ্কা

বাজারে আলুর দাম কমছেই। উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। লোকসানের আশঙ্কায় অনেকে হিমাগার থেকে আলু তুলছেন না। ফলে জয়পুরহাটের ২২টি হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। আগামী ১৫ নভেম্বর সংরক্ষণের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এসব আলু বিক্রি করতে না পারলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকেরা।

এ পরিস্থিতিতে আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি এবং হিমাগারে সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। লোকসানের আশঙ্কায় হিমাগার মালিকেরা জেলা কৃষি বিপণন অফিসের সহায়তা চেয়েছেন। অন্যদিকে সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে হিমাগারগুলোতে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা কৃষি বিপণন অফিস।

উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বিক্রি
জয়পুরহাট দেশের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা। গত মৌসুমে জেলায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদন মৌসুমে বাজারে দাম কম থাকায় লোকসানে পড়েন কৃষকেরা। পরে দাম বাড়ার আশায় জেলার ২২টি হিমাগারে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ২ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় এখন উৎপাদন খরচের পাশাপাশি হিমাগারের ভাড়া তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খরচ মিলিয়ে স্টেরিক, কার্ডিনাল ও বারো-তেরো জাতের ৬০ কেজির এক বস্তা আলু উৎপাদনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫০ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ হিমাগার গেটে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫৫০ থেকে ৬৭০ টাকায়। দেশি পাকড়ি জাতের এক বস্তা আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০ টাকায়। ফলে জাতভেদে প্রতি বস্তায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

হিমাগার মালিকদেরও বাড়ছে লোকসান
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে আলু কিনে ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন না করলেও চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে পারেন না হিমাগার মালিকেরা। অথচ বিদ্যুৎ বিলসহ হিমাগারের পরিচালন ব্যয় তাঁদেরই বহন করতে হয়। ফলে আলু পড়ে থাকলে লোকসানের চাপ বাড়ছে হিমাগার মালিকদের ওপরও।

এবার হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলু উত্তোলন না হলে বিদ্যুৎ বিল, ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি বস্তায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন হিমাগার মালিকেরা।

সদরের আমদই গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘আলুর দাম বাড়বে আশায় হিমাগারে ১৫০ বস্তা আলু রেখেছিলাম। এর মধ্যে ৫০ বস্তা কোনো লাভ ছাড়াই বিক্রি করেছি। এখনো ১০০ বস্তা আলু পড়ে আছে। বর্তমান বাজারে বিক্রি করলে অর্ধেক লোকসান হবে। ঋণ-দেনা তো পরিশোধ হবেই না, উল্টো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হব। আলু নিয়ে কী করব, মাথাই কাজ করছে না।’

ক্ষেতলালের হিমাদ্রিপাড়ার কৃষক বাবু মিয়া বলেন, ‘হিমাগারে ৫০ বস্তা আলু রেখেছি। বর্তমান বাজারে বিক্রি করলে অনেক লোকসান হবে। আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সংরক্ষণের মেয়াদ আছে। এর মধ্যে দাম না বাড়লে কীভাবে বিক্রি করব? পরে মেয়াদ না বাড়ালে আলু কোথায় নিয়ে যাব? সরকারের কাছে অনুরোধ, হিমাগারে আলু রাখার মেয়াদ ও আলুর দাম বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হোক।’

তিলাবদুল মধ্যপাড়ার ব্যবসায়ী আলাল হোসেন বলেন, ‘এক বস্তা আলুতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২৫০ টাকা, অথচ বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকায়। গত তিন-চার বছর ধরে লোকসান গুনতে গুনতে জমি-জমা সব শেষ। এখন যে ঋণ আছে, তা কীভাবে শোধ করব? ঋণ পরিশোধ করতে বাড়িও বিক্রি করতে হতে পারে। সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে আমি একেবারে শেষ।’

হিমাদ্রি হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার হিমাগারে ৫০ শতাংশ আলু বের হয়েছে। বাজারমূল্য একেবারেই কম হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন করছেন না। চুক্তির মেয়াদ পার হয়ে আলু পড়ে থাকলে সব লোকসান আমার। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হব। সরকার আলু রপ্তানির সুযোগ দিলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।’

জেলা কৃষি বিপণন অফিস জানিয়েছে, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হিমাগারগুলোতে চিঠি দেওয়া হবে। তবে বাজারে দাম না বাড়লে এবং সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকর না হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের লোকসানের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সন্ধানী বার্তা/এসএস/জেএন


সম্পর্কিত খবর