চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ২৮৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। এসব ভুল তথ্য যাচাই করে ২২৩টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শনাক্ত হওয়া অপতথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক বিষয়ক, যার সংখ্যা ১৩০।
রিউমর স্ক্যানারের অক্টোবর মাসের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়েও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। গত মাসে ধর্মীয় বিষয়ে ৫১টি, জাতীয় বিষয়ে ৫০টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ৩৮টি, বিনোদন বিষয়ে ৯টি, খেলাধুলায় ৩টি, শিক্ষায় ২টি এবং প্রতারণা ও অন্যান্য বিষয়ে একটি করে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
ভিডিওতে বেশি ছড়িয়েছে অপতথ্য
অক্টোবরে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যের মধ্যে ভিডিওকেন্দ্রিক ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৪০টি। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্রিক ১০৯টি, ছবিকেন্দ্রিক ৩৪টি এবং অডিওকেন্দ্রিক দুটি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
ধরন অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে ২০৬টি মিথ্যা, ২২টি বিকৃত এবং ৫৭টি বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। এ প্ল্যাটফর্মে ২৪২টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া এক্সে ৩৯টি, ইনস্টাগ্রামে ৩৩টি, টিকটকে ২৯টি, ইউটিউবে ২০টি, থ্রেডসে তিনটি এবং টেলিগ্রামে অন্তত একটি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ভুল তথ্য প্রচারে দেশের গণমাধ্যমেরও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ২৮টি ঘটনায় একাধিক দেশীয় গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি চারটি ঘটনায় ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ৫২টি
বাংলাদেশ ও ভারতকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের প্রবণতা অক্টোবরেও ছিল উল্লেখযোগ্য। দুর্গাপূজাকে ঘিরে এ ধরনের অপতথ্যের সংখ্যা বেড়েছে। গত মাসে ৫২টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ২৮টি ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, বিএনপি সরকারকে জড়িয়ে ২৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জড়িয়ে প্রচারিত হয়েছে ১০টি অপতথ্য, যার প্রায় সবগুলোতেই তাঁকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ৯টি অপতথ্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চারটি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সবগুলোতেই তাঁকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরে অপতথ্য
রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে প্রচারিত অপতথ্যের মধ্যে বিএনপি, দলটির অঙ্গসংগঠন ও নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২৯টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে নিয়ে ১৭টি, ছাত্রদলকে নিয়ে তিনটি এবং যুবদলকে নিয়ে একটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, দলটির অঙ্গসংগঠন ও নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দলটিকে নিয়ে ১০টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশেই নেতিবাচক মনোভাব তৈরির সুযোগ ছিল। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে পাঁচটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার সবগুলোই নেতিবাচক। এ ছাড়া ছাত্রশিবিরকে নিয়ে দুটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ১৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দলটিকে নিয়ে পাঁচটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার ৮০ শতাংশে নেতিবাচক উপস্থাপন ছিল। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে একটি নেতিবাচক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, দলটির অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে ৪৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দলটিকে নিয়ে ১৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৯৪ শতাংশেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব তৈরির সুযোগ ছিল। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ১৭টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার সবগুলোই ইতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এআই দিয়ে তৈরি ৩৮টি ভুয়া কনটেন্ট
অক্টোবর মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ৩৮টি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দুটি ছিল ডিপফেক কনটেন্ট। এ ছাড়া সার্কাজম পেজের ৩২টি কনটেন্ট বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
মাসটিতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে চারটি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে মোট ১৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে শনাক্ত হয়েছে তিনটি ভুল তথ্য।
অক্টোবরে অন্তত সাতটি ঘটনা বা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে দুর্গাপূজা ইস্যুতে ৪৪টি, ভারতে আন্দোলন ইস্যুতে ১৬টি, সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ইস্যুতে ১০টি, সাজেকে সংঘাত ইস্যুতে ১০টি, মাদরাসায় যৌন নিপীড়ন ইস্যুতে ৯টি এবং জাতিসংঘ অধিবেশন ইস্যুতে সাতটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ২৭টি ঘটনায় দেশি-বিদেশি ১৩টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
সন্ধানী বার্তা/এএইচ/জেএন