দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতপণ্য। লুঙ্গি, গামছা ও শাড়ির সুনাম ছড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। আড়াই লক্ষাধিক তাঁতকে কেন্দ্র করে জেলায় প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষের। প্রতিবছর গড়ে দেড় হাজার কোটি টাকার তাঁতপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এ শিল্প। তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে সিরাজগঞ্জকে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে ‘তাঁতকুঞ্জ সিরাজগঞ্জ’ নামে।
একসময় ভোরের আলো ফুটতেই সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লিগুলো মুখর হয়ে উঠত হস্তচালিত তাঁতের খটখট শব্দে। সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্পে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। উৎপাদন বাড়াতে কারখানাগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ার লুম। বর্তমানে জেলায় হ্যান্ডলুম ও পাওয়ার লুম মিলিয়ে সক্রিয় তাঁতের সংখ্যা আড়াই লক্ষাধিক। এসব তাঁতে তৈরি হচ্ছে নানা নকশা ও মানের লুঙ্গি, গামছা ও শাড়ি।
ঈদ-পয়লায় বাড়ে কর্মব্যস্ততা
তাঁতপল্লির শ্রমিক আব্দুস ছালাম ও সবুর আলী জানান, সারা বছরই তাঁতশিল্পে কাজের সুযোগ থাকে। তবে বাংলা নববর্ষ এবং দুই ঈদকে কেন্দ্র করে পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় কাজের চাপও বাড়ে। প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালানো এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় বলে জানান তাঁরা।
দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানি
সিরাজগঞ্জের তাঁতপণ্যের চাহিদা এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশেও রয়েছে। তাঁত মালিক আসাদ মুন্সি বলেন, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি, শাড়ি ও গামছার কদর দেশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা স্থানীয় হাটে এসে এসব পণ্য কিনে নিয়ে যান। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাজারেও নিয়মিত যাচ্ছে এখানকার তাঁতপণ্য।
বেলকুচি তাঁত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বৈদ্যনাথ জানান, জেলায় আড়াই লক্ষাধিক তাঁতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কাজ করছেন। দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি উন্নত মানের তাঁতপণ্য দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম অর্জন করছে। সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি ও গামছা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের কাজের অনুপ্রেরণা আরও বেড়েছে।
জিআই স্বীকৃতির বিষয়ে বেলকুচি তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি হাজি আব্দুল বাকী বলেন, এই অর্জন তাঁতসংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার ফল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় তাঁতপণ্যের পরিচিতি ও বাজার আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন বড় কোম্পানি সিরাজগঞ্জের স্থানীয় হাট ও কারখানা থেকে সরাসরি উন্নত মানের লুঙ্গি ও গামছা সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করছে। এর মাধ্যমে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতপণ্য।
ঐতিহ্য থেকে অর্থনীতির শক্তি
সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, জেলার অর্থনীতিরও অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ শ্রমিক, পাইকারি বাজার এবং রপ্তানির সুযোগ—সব মিলিয়ে এ শিল্পের সম্ভাবনা বাড়ছে। ‘তাঁতকুঞ্জ সিরাজগঞ্জ’ ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে এই পরিচিতি আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, মান বজায় রাখা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প দেশের রপ্তানি অর্থনীতিতেও আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
সন্ধানী বার্তা/এসএ/জেএন