একজনের নাম আলমাছ, অন্যজন আলমাস। মাঝখানে মাত্র একটি অক্ষরের ফারাক। কিন্তু এই সামান্য নামের অমিলই একজনের জীবনে ডেকে এনেছে ভয়াবহ পরিণতি। যে অস্ত্র মামলায় তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, সেই মামলার ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে মামলার প্রকৃত দণ্ডিত ব্যক্তি রয়েছেন কানাডায়।
ঘটনাটি ঢাকার দোহার উপজেলার। কারাগারে থাকা ব্যক্তির নাম মো. আলমাস। তাঁর বাড়ি কুসুমহাটি ইউনিয়নের সুন্দরীপাড়া গ্রামে। আর অস্ত্র মামলায় দণ্ডিত মো. আলমাছের বাড়ি একই উপজেলার নয়াবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর গ্রামে। নামের সাদৃশ্য, বাবার নামের আংশিক মিল এবং ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি—সব মিলিয়ে এক ব্যক্তির অপরাধের দায় গিয়ে পড়েছে অন্যজনের ওপর।
- একজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা, আরেকজনের জীবনে কারাবাস
- নামের সঙ্গে ঠিকানার গরমিলে ঘটে গেল ভয়াবহ বিপত্তি
- হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য, প্রকৃত দণ্ডিত ব্যক্তি রয়েছেন কানাডায়
ঘটনার ভয়াবহতা সামনে আসে আলমাসের করা রিট আবেদনের পর। তাঁর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট পরিচয় যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশে পরিচালিত তদন্তে উঠে আসে, কারাগারে থাকা আলমাস এবং অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ব্যক্তি। অর্থাৎ, ভুল মানুষকেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তে বেরিয়ে এলো আসল চিত্র
গত ৬ সেপ্টেম্বর রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারির পাশাপাশি দুই ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে তদন্ত পরিচালনা এবং ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান। প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, মো. আলমাস ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মিরপুর থানায় দায়ের করা ৩২ নম্বর অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। ওই মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তি হলেন মো. আলমাছ।
প্রতিবেদনে দুই ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয়ও আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে। আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল এবং মায়ের নাম রশনারা বেগম। অন্যদিকে প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের বাবার নাম খলিলুর রহমান, যিনি মো. আবুল খায়ের খলিল নামেও পরিচিত। তাঁর মায়ের নাম সালমা আক্তার। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত আসামি বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
বয়সের হিসাবও বলছে, ভুল মানুষ কারাগারে
শুধু নাম কিংবা ঠিকানা নয়, বয়সের হিসাবেও দুই ব্যক্তির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। মামলার নথিতে ২০০২ সালে আলমাছের বয়স উল্লেখ করা হয়েছিল ২৪ বছর। সে হিসাবে ২০২৬ সালে তাঁর বয়স হওয়ার কথা প্রায় ৪৮ বছর।
অন্যদিকে, আলমাসের জন্ম ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৫। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে তাঁর বয়স প্রায় ৪১ বছর। অর্থাৎ, ২০০২ সালে অস্ত্র মামলাটি দায়েরের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। তদন্ত প্রতিবেদনে বয়সের এই ব্যবধানকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
যে তিন ভুলে বদলে গেল মানুষের ভাগ্য
তদন্ত প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, আলমাস ২০০৭ সালের আগে পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অন্যদিকে প্রকৃত আসামি আলমাছের বাড়ি পূর্ব ধোয়াইর গ্রামও একই ডাকঘরের আওতাভুক্ত। ডাকঘরের নাম ধরে ঠিকানা ব্যবহারের কারণে দুই ব্যক্তির পরিচয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, দুই ব্যক্তির বাবার নামের মধ্যেও আংশিক মিল ছিল। প্রকৃত আসামির বাবার নাম খলিলুর রহমান বা মো. আবুল খায়ের খলিল। আর আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। এই নামের সাদৃশ্য পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি আরও বাড়ায়।
তৃতীয়ত, মামলার নথিতেই ঘটে সবচেয়ে বড় ভুল। প্রকৃত আসামি আলমাছের ঠিকানা ‘পূর্ব ধোয়াইর’ হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে লেখা হয় ‘দক্ষিণ বাহ্রা’। পরবর্তী সময়ে মামলার অন্যান্য নথি এবং সাজা কার্যকরের জন্য জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও সেই ভুল ঠিকানা বহাল থাকে। ফলে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে একই ডাকঘর এলাকার অন্য বাসিন্দা আলমাসকে শনাক্ত করার পথ তৈরি হয়।
২০০২ সালের মামলা, ২০২৫ সালে এসে কারাবাস
মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ। ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপর আসামি নাজমুলকে খালাস দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আলমাছ পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ২০ মার্চ জারি করা পরোয়ানার ভিত্তিতে গত বছরের ৫ নভেম্বর পুলিশ আলমাসকে আদালতে হাজির করে। সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। সেই থেকে কারাগারই তাঁর ঠিকানা।
এদিকে, রিট আবেদনটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয় বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে। শুনানি শেষে আদালত আগামী রবিবার আদেশের দিন ধার্য করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দিন মো. হানিফ।
একটি নামের সামান্য পার্থক্য, ঠিকানার একটি ভুল আর পরিচয় যাচাইয়ে গরমিল—সব মিলিয়ে একজন মানুষকে প্রায় এক বছর ধরে কাটাতে হচ্ছে কারাগারে। অথচ তদন্ত বলছে, যে মামলায় তাঁর সাজা ভোগ করার কথা, সেই মামলার প্রকৃত আসামিই তিনি নন। এখন হাইকোর্টের আদেশের অপেক্ষা।
সন্ধানী বার্তা/এএএন/জেএন