আরও

মৃত্যুর মুখেও ভয় পাননি মাতা হারি, রহস্য আজও অমীমাংসিত

১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। ফ্রান্সের ভিনসেনের একটি সামরিক এলাকায় মৃত্যুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। সামনে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়েছেন বন্দুকধারী সেনারা। কয়েক মুহূর্ত পরই গর্জে উঠবে বন্দুক। শেষ হয়ে যাবে তাঁর জীবন। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো মানুষের ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। অথচ প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর মুখেও ওই নারীর চোখেমুখে ছিল না আতঙ্কের ছাপ। চোখ বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি গুলি ছোড়ার ঠিক আগে সেনাদের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দিয়েছিলেন বলেও প্রচলিত রয়েছে।

সেই রহস্যময় নারী আর কেউ নন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আলোচিত চরিত্র মাতা হারি। একসময় ইউরোপের অভিজাত সমাজে পরিচিত ছিলেন নৃত্যশিল্পী হিসেবে। ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিল তাঁর ওঠাবসা। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত সেই অভিযোগেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনি কি সত্যিই বিপজ্জনক গুপ্তচর ছিলেন, নাকি যুদ্ধের উত্তাল সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন? শত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ প্রশ্নের পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

সাধারণ জীবন থেকে রহস্যময় মাতা হারি

​
মাতা হারি তাঁর প্রকৃত নাম নয়। ১৮৭৬ সালের ৭ আগস্ট নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই নারীর আসল নাম মার্গারেটা গেরট্রুইডা জেলে। শৈশবে তাঁর জীবন ছিল আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ডাচ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ ম্যাকলিওডকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কয়েক বছর ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে, বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া, বসবাস করেন।

তবে তাঁদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯০২ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। জীবনের এই পরিবর্তনের পর নতুনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন মার্গারেটা। পাড়ি জমান ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়।

নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিতি, রহস্যময় পরিচয়ের জন্ম

​
প্যারিসে এসে মার্গারেটা নিজের জন্য তৈরি করেন এক নতুন পরিচয়। নাম নেন ‘মাতা হারি’। মালয় ভাষায় এই নামের অর্থ সূর্য বা দিনের চোখ, যা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন নামের পাশাপাশি নিজের অতীত ও পরিচয় ঘিরেও তৈরি করেন নানা রহস্যময় গল্প।

১৯০৫ সালে প্যারিসে তাঁর নৃত্য পরিবেশনা আলোচনায় আসে। শরীরে আকর্ষণীয় পোশাক ও অলংকার, সঙ্গে প্রাচ্যের মন্দিরের নৃত্য নিয়ে নানা বর্ণনা—সব মিলিয়ে দ্রুত দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন তিনি। নিজেকে ভারতীয় মন্দিরের পবিত্র নৃত্যধারার সঙ্গে পরিচিত বলে দাবি করতেন। তবে তাঁর এই পরিচয়ের অনেকটাই ছিল মঞ্চে দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি করা কাহিনি।

অল্প সময়ের মধ্যেই মাতা হারির নাচের খ্যাতি প্যারিস ছাড়িয়ে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সৌন্দর্য, মঞ্চে উপস্থিতি এবং রহস্যময় ব্যক্তিত্ব তাঁকে অভিজাত সমাজের আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কই বাড়ায় কৌতূহল

​
নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি ইউরোপের ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, কূটনীতিক ও সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। একাধিক প্রভাবশালী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেও তাঁকে নিয়ে নানা আলোচনা চলত।

এই পরিচিতি তাঁকে যেমন সামাজিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তেমনি পরবর্তী সময়ে সন্দেহের মুখেও ফেলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে আসে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগ তখন আর কেবল ব্যক্তিগত বিষয় থাকেনি; যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার প্রশ্নেও তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ছায়ায় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ

​
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বাড়ে। কে কোন পক্ষের হয়ে কাজ করছেন, কার সঙ্গে কার যোগাযোগ রয়েছে—এসব বিষয়ে নজরদারি শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে মাতা হারির আন্তর্জাতিক পরিচিতি তাঁকে সন্দেহের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯১৫ সালে জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা তাঁকে অর্থের বিনিময়ে তথ্য সংগ্রহের প্রস্তাব দেন। মাতা হারি সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন বলে কিছু বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরে তিনি ফরাসি গোয়েন্দাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। ফলে তিনি আসলে কোন পক্ষের হয়ে কাজ করছিলেন, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

ফরাসি কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, জার্মান গোয়েন্দাদের কাছে মাতা হারি ‘এইচ-২১’ বা H-21 নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্যারিস থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন এবং মিত্রপক্ষের সেনাদের ক্ষতির কারণ হয়েছেন।

সত্যিই কি ছিলেন ভয়ংকর গুপ্তচর?

​
১৯১৭ সালের জুলাইয়ে সামরিক আদালতে মাতা হারির বিচার শুরু হয়। বিচারে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং মামলার প্রমাণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

কিছু গবেষকের মতে, মাতা হারি জার্মানদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন এবং গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য সরবরাহ করেছিলেন, কিংবা তাঁর দেওয়া তথ্যের কারণে মিত্রপক্ষের কতটা ক্ষতি হয়েছিল, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।

অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তাঁকে অত্যন্ত কার্যকর গুপ্তচর হিসেবে উপস্থাপনের মতো অকাট্য প্রমাণ ছিল না। বরং যুদ্ধের সময় ফরাসি সেনাবাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, জনমনে হতাশা এবং সামরিক ব্যর্থতার মধ্যে একজন পরিচিত নারীকে দায়ী করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

তাঁর সামাজিক পরিচিতি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রহস্যময় ব্যক্তিত্ব তাঁকে সহজেই সন্দেহের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল বলে মনে করেন কেউ কেউ। এ কারণে মাতা হারির বিচার ও মৃত্যুদণ্ডকে ঘিরে আজও বিতর্ক রয়েছে।

বন্দুকের সামনে শেষ মুহূর্তে কী করেছিলেন মাতা হারি?

​
১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর ভোরে ভিনসেনের কাছে ফরাসি ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয় মাতা হারিকে। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪১ বছর। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি চোখ বাঁধতে অস্বীকার করেন। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হন।

তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি। বলা হয়, গুলি ছোড়ার ঠিক আগে তিনি সেনাদের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দিয়েছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তের এই ঘটনার বিবরণ সব ঐতিহাসিক সূত্রে একইভাবে পাওয়া যায় না।

ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে সেদিন শেষ হয় তাঁর জীবন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রহস্যের অবসান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাতা হারি হয়ে ওঠেন সৌন্দর্য, প্রলোভন, গুপ্তচরবৃত্তি ও যুদ্ধকালীন ষড়যন্ত্রের প্রতীক।

এক শতাব্দী পরও যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি

​
মাতা হারির জীবনকে ঘিরে আজও মানুষের আগ্রহের অন্যতম কারণ তাঁর দ্বৈত পরিচয়। একদিকে তিনি ছিলেন আলোচিত নৃত্যশিল্পী, যিনি নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন এক রহস্যময় জগৎ। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জড়িয়ে পড়েন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তৎপরতা ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে।

তিনি কি সত্যিই জার্মানির হয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছিলেন, নাকি যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে তাঁকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল—এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

তাঁর জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মাতা হারির মৃত্যু তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি। বরং মৃত্যুর পর তাঁর জীবন আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আর সেই রহস্যই এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত নারী চরিত্র হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন, দ্য গার্ডিয়ান

সন্ধানী বার্তা/এসএ/জেএন


সম্পর্কিত খবর