সৌরজগতে প্লুটোর কক্ষপথের বাইরে নতুন একটি বামন গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ‘ইডি১৩৮’ নামের এই মহাজাগতিক বস্তুটি আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের (আইএইউ) স্বীকৃতি পেলে সৌরজগতের ষষ্ঠ বামন গ্রহ হিসেবে তালিকাভুক্ত হবে। চিলিতে অবস্থিত ভেরা সি রুবিন অবজারভেটরির শক্তিশালী টেলিস্কোপে ধারণ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে বস্তুটির সন্ধান পাওয়া গেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ও স্মিথসোনিয়ানের জ্যেষ্ঠ জ্যোতিঃপদার্থবিদ ম্যাথিউ হোলম্যান নতুন এই বামন গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বস্তুটির আকার ও অবস্থান সৌরজগতের বাইরের অঞ্চল সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।
সেরেসের চেয়েও বড় হতে পারে
ম্যাথিউ হোলম্যানের তথ্যমতে, ইডি১৩৮-এর ব্যাস ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে হতে পারে। সে হিসাবে এটি বর্তমানে স্বীকৃত সবচেয়ে ছোট বামন গ্রহ সেরেসের চেয়েও বড় হতে পারে।
বর্তমানে বস্তুটি সূর্য থেকে প্রায় ৪৬ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরে অবস্থান করছে। এক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট হলো পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব। ফলে ইডি১৩৮ প্লুটোর চেয়েও দূরের অঞ্চলে রয়েছে। সৌরজগতের এই প্রত্যন্ত এলাকায় থাকা বস্তুগুলো শনাক্ত করা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বরাবরই কঠিন।
এত দিন আড়ালে ছিল কেন
ইডি১৩৮ এত দিন শনাক্ত না হওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, বস্তুটি দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে অবস্থান করায় উত্তর গোলার্ধ থেকে এটি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। দ্বিতীয়ত, এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একই সমতলে অবস্থান করছে।
আমাদের গ্যালাক্সিতে অসংখ্য তারা থাকায় ওই অঞ্চলে দূরবর্তী কোনো চলমান মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত করা সহজ নয়। তারার আলোর ভিড়ে ছোট ও দূরবর্তী বস্তুগুলোর অবস্থান ও গতিবিধি আলাদা করে চিহ্নিত করতে বিশেষ পর্যবেক্ষণ এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়।
নতুন গবেষণার সম্ভাবনা
নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবারির সহযোগী অধ্যাপক মিশেল ব্যানিস্টার ইডি১৩৮-কে বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি একটি বৃহৎ ট্রান্স-নেপচুনিয়ান অবজেক্ট বা টিএনও। নেপচুনের কক্ষপথের বাইরের অঞ্চলে থাকা এ ধরনের বস্তু সৌরজগতের গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ইডি১৩৮ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে অন্যান্য টেলিস্কোপও পর্যবেক্ষণ শুরু করবে। এর আকার, গঠন, কক্ষপথ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে সৌরজগতের বাইরের অংশ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
কীভাবে নির্ধারিত হয় বামন গ্রহ
২০০৬ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন গ্রহের আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সেখানে গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তিনটি শর্তের কথা বলা হয়।
প্রথমত, বস্তুটিকে সূর্যকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘুরতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজস্ব মহাকর্ষ বলের প্রভাবে বস্তুটির আকৃতি প্রায় গোলাকার হতে হবে। তৃতীয়ত, নিজের কক্ষপথের আশপাশের অঞ্চল থেকে অন্য বস্তুগুলোকে সরিয়ে দিয়ে কক্ষপথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বামন গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে এবং নিজস্ব মহাকর্ষের কারণে প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। তবে এটি নিজের কক্ষপথের আশপাশের অঞ্চলকে অন্য বস্তু থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে পারে না। প্লুটোকে ২০০৬ সালে এই সংজ্ঞার ভিত্তিতেই বামন গ্রহের শ্রেণিতে রাখা হয়।
ইডি১৩৮ এখনো আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। স্বীকৃতি পেলে সৌরজগতের পরিচিত বামন গ্রহের তালিকায় নতুন একটি নাম যুক্ত হবে। একই সঙ্গে সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চল নিয়ে গবেষণায় খুলে যেতে পারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। সূত্র: সিএনএন
সন্ধানী বার্তা/এসএ/জেএন