কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) দুই শিক্ষার্থীকে পুলিশ পরিচয়ে তল্লাশির ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই পুলিশ সদস্য ও তাঁদের এক সোর্সকে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে মারধর করেছেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে সোপর্দ করা হয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ঘটনাটিকে ভুল-বোঝাবুঝি হিসেবে উল্লেখ করে সমাধান করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাত ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশের উপস্থিতিতে বিষয়টির সমাধান হয়।
টিউশন শেষে ফেরার পথে তল্লাশি
ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁদের ভাষ্য, টিউশন শেষে কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকার একটি গলি দিয়ে ফেরার পথে পুলিশ পরিচয়ে দুই ব্যক্তি তাঁদের গতিরোধ করেন। এ সময় তল্লাশির নামে তাঁদের পকেটে হাত দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীরা পরিচয় জানতে চাইলে তাঁদের একজন পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে এক শিক্ষার্থীর শার্টের কলার ধরেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। তল্লাশির পর কিছু না পেয়ে ওই ব্যক্তিরা চলে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরিচয়পত্র দেখতে চান। তখন তাঁরা পুলিশ পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে ওয়াকি-টকি ও হ্যান্ডকাফ দেখান। তবে পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সন্দেহ আরও বাড়ে।
বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নেওয়ার পর মারধর
শিক্ষার্থীদের দাবি, ওই ব্যক্তিরা পরিচয়পত্র দেখাতে না পারায় তাঁদের ছিনতাইকারী সন্দেহ করেন তাঁরা। পরে ঈদগাহ থেকে পুলিশ লাইনস হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গামী সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার বাসে তাঁদের তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাসটি ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ওই তিনজনকে মারধর করছেন। পরে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়।
দুজন পুলিশ সদস্য, অন্যজন সোর্স
প্রক্টর অফিসে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস নিশ্চিত করেন, ওই তিনজনের মধ্যে দুজন কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ সদস্য এবং অন্যজন পুলিশের সোর্স।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধ দমনের লক্ষ্যে তাঁরা সাদা পোশাকে কৌশলে টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। এ সময় সন্দেহভাজন হিসেবে দুই শিক্ষার্থীকে তল্লাশি করা হয়। পরে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিলে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ সদস্যদের দাবি, শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সেখানে আরও শিক্ষার্থী উপস্থিত হয়ে তাঁদের ওপর চড়াও হন। পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ না দিয়েই জোর করে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে মারধর করা হয়।
ওসির প্রশ্ন, এভাবে কাউকে তুলে নেওয়া যায় কি না
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, তাঁদের কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। এ কারণে অনেক পুলিশ সদস্য সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বলেন, ‘আজকে যা ঘটেছে, তা শিক্ষার্থীরা আমাকে জানাতে পারতেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারতেন। তারা কি এভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারেন? এতে বাইরে একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে।’
উভয় পক্ষের ভুল স্বীকার, সমাধান প্রক্টর অফিসে
রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে প্রক্টরিয়াল বডি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়। পরে ঘটনাটিকে ভুল-বোঝাবুঝি হিসেবে আখ্যায়িত করে বিষয়টির সমাধান করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, তল্লাশির সময় শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও বিষয়টি স্বীকার করেছে। পরে এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে জোর করে বাসে তুলে তাঁদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়।
প্রক্টর বলেন, ‘এখানে উভয় পক্ষেরই ভুল রয়েছে। উভয় পক্ষের কথা শুনে যুক্তিসংগত জায়গায় এসে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে এবং উভয় পক্ষই তা মেনে নিয়েছে।’ ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষ পেশাদারিত্ব বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও পুলিশ—উভয় পক্ষকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান প্রক্টর।
সন্ধানী বার্তা/এসএ/ইএকে